
দীর্ঘ সময় বন্ধ জুতা পরে থাকার পর তা খুললেই অনেকের পায়ে তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। এমনকি পা পরিষ্কার থাকলেও এ সমস্যা হতে পারে। এর প্রধান কারণ ঘাম, ত্বকে থাকা ব্যাকটেরিয়া এবং জুতা ও মোজার ভেতরে জমে থাকা আর্দ্রতার পারস্পরিক ক্রিয়া।
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় কিংবা প্রতিদিন একই জুতা পরলে পায়ের দুর্গন্ধ আরও বাড়তে পারে। সাধারণত শুধু ঘামের কারণে এ গন্ধ তৈরি হয় না। বরং উষ্ণ ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ত্বকের ব্যাকটেরিয়া ঘামের উপাদান ভেঙে দুর্গন্ধযুক্ত যৌগ তৈরি করে। তবে গন্ধ খুব তীব্র হলে বা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে কখনো কখনো তা ত্বকের কোনো সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।
জুতার ভেতরে পায়ে দুর্গন্ধ হয় কেন?
মানুষের পায়ে প্রচুর ঘর্মগ্রন্থি রয়েছে। ঘাম নিজে সাধারণত দুর্গন্ধযুক্ত নয়। কিন্তু মোজা ও বন্ধ জুতার ভেতরে ঘাম আটকে থাকলে ত্বকে থাকা ব্যাকটেরিয়া ঘামের উপাদান ভেঙে বিভিন্ন গন্ধযুক্ত যৌগ তৈরি করে। বন্ধ জুতার ভেতরে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ তৈরি হওয়ায় ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধিও সহজ হয়। ফলে দুর্গন্ধ আরও তীব্র হতে পারে।
এ কারণে কয়েক ঘণ্টা জুতা পরে থাকার পর গন্ধ বেশি অনুভূত হয়। এনসাইক্লোপিডিয়া অব স্মেল হিস্ট্রি অ্যান্ড হেরিটেজ-এও পায়ের দুর্গন্ধের সঙ্গে জুতার ভেতরে ঘাম জমে থাকার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। পায়ের ঘাম বন্ধ জুতার অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে আটকে থাকলে ব্যাকটেরিয়া তা ভেঙে দুর্গন্ধযুক্ত উপাদান তৈরি করতে পারে।
তাই পায়ের দুর্গন্ধ কমাতে জুতার ভেতরে বাতাস চলাচলের সুযোগ তৈরি করা, ভেজা মোজা ও জুতা বদলানো এবং ব্যবহারের পর জুতা শুকিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কারও কারও পায়ে দুর্গন্ধ বেশি হয় কেন?
সব মানুষের পায়ে সমান পরিমাণ ঘাম হয় না। কারও কারও পায়ে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে। পায়ের তলায় এ ধরনের অতিরিক্ত ঘামকে প্ল্যান্টার হাইপারহাইড্রোসিস বলা হয়। ঘামের কারণে মোজা ও জুতা দীর্ঘ সময় ভেজা থাকলে দুর্গন্ধ তৈরির পরিবেশও অনুকূল হয়ে ওঠে।
এ ছাড়া কয়েকটি কারণে পায়ের দুর্গন্ধ বাড়তে পারে। যেমন:
- দীর্ঘ সময় বন্ধ জুতা পরে থাকা
- প্রতিদিন একই জুতা ব্যবহার করা
- ঘামে ভেজা মোজা দীর্ঘক্ষণ পরে থাকা
- বাতাস চলাচল করতে পারে না, এমন জুতা পরা
- গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা
- পায়ের ত্বকে সংক্রমণ থাকা
- ব্যবহারের পর জুতা শুকানোর সুযোগ না দেওয়া
তাই কারও পায়ে অন্যদের তুলনায় বেশি দুর্গন্ধ হলেই তাঁর ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা খারাপ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। অতিরিক্ত ঘাম ও ত্বকের সমস্যাও এর কারণ হতে পারে।
পায়ের দুর্গন্ধ কি ছত্রাক সংক্রমণের লক্ষণ?
পায়ে দুর্গন্ধ হলেই যে ছত্রাকের সংক্রমণ হয়েছে, তা নয়। তবে দুর্গন্ধের পাশাপাশি ত্বকে পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পায়ের ছত্রাক সংক্রমণ, যা অ্যাথলেটস ফুট বা টিনিয়া পেডিস নামে পরিচিত, হলে কয়েকটি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন:
- পায়ে চুলকানি
- ত্বক ওঠা বা খসখসে হয়ে যাওয়া
- ত্বক লাল হয়ে যাওয়া
- পায়ের আঙুলের ফাঁকে ফাটল তৈরি হওয়া
- আক্রান্ত স্থানে ব্যথা
- ছোট ছোট তরলভর্তি ফোস্কা
উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে ছত্রাক সহজে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। তাই ঘামে ভেজা পা এবং দীর্ঘ সময় বন্ধ জুতা পরে থাকা এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তীব্র দুর্গন্ধের কারণ কি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ?
নিয়মিত পা ধোয়া ও মোজা বদলানোর পরও যদি পায়ের দুর্গন্ধ অস্বাভাবিকভাবে তীব্র থাকে, তাহলে এর পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে। এমন একটি কারণ হলো পিটেড কেরাটোলাইসিস। এটি পায়ের ত্বকের উপরিভাগে হওয়া এক ধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ।
দীর্ঘ সময় পা ঘামে ভেজা থাকলে এবং জুতার ভেতরে আর্দ্রতা জমে থাকলে কিছু নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া অতিরিক্ত বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এর ফলে তীব্র দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে। পিটেড কেরাটোলাইসিসের ক্ষেত্রে পায়ের তলায় ছোট ছোট গর্ত বা খাঁজ দেখা যায়। বিশেষ করে পায়ের যেসব অংশে বেশি চাপ পড়ে, সেসব জায়গায় এই পরিবর্তন লক্ষ করা যেতে পারে।
তাই দুর্গন্ধ বারবার ফিরে এলে পায়ের তলা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে, সেখানে ছোট গর্ত বা খাঁজ তৈরি হয়েছে কি না।
এফপি এসেনশিয়ালস-এর একটি পর্যালোচনায় টিনিয়া পেডিস, প্ল্যান্টার ওয়ার্টস এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত পিটেড কেরাটোলাইসিসের মতো পায়ের ত্বকের সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা এসব সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পায়ের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ও ঘাম জমা কমানোর পাশাপাশি সংক্রমণের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। ছত্রাক সংক্রমণে চিকিৎসকের পরামর্শে ছত্রাকনাশক ওষুধ এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে জীবাণুনাশক বা অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে।
সমস্যা গুরুতর হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা বারবার ফিরে এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিদিন একই জুতা পরলে কি দুর্গন্ধ বাড়ে?
হ্যাঁ, একই জুতা প্রতিদিন ব্যবহার করলে দুর্গন্ধ বাড়তে পারে। জুতার ভেতরে জমে থাকা ঘাম ও আর্দ্রতা পুরোপুরি শুকাতে সময় লাগে। শুকানোর আগেই আবার জুতা পরলে ভেতরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ বজায় থাকে। এতে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের টিকে থাকার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে যাঁদের পায়ে অতিরিক্ত ঘাম হয় কিংবা যাঁদের দীর্ঘ সময় বন্ধ জুতা পরে থাকতে হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক জোড়া জুতা পালা করে ব্যবহার করলে প্রতিটি জুতা শুকানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। এতে দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে।
পায়ের দুর্গন্ধ কমাতে কী করবেন?
পায়ের দুর্গন্ধ কমাতে দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
- প্রতিদিন পা পরিষ্কার করে ধুয়ে নিন।
- ধোয়ার পর পা ভালোভাবে শুকিয়ে নিন, বিশেষ করে আঙুলের ফাঁকগুলো।
- প্রতিদিন পরিষ্কার মোজা পরুন। ঘামে ভিজে গেলে প্রয়োজনে দিনে একাধিকবার মোজা বদলান।
- বাতাস চলাচল করতে পারে কিংবা আর্দ্রতা শোষণ করে, এমন মোজা বেছে নিন।
- ব্যবহারের পর জুতা পুরোপুরি শুকিয়ে নিয়ে আবার পরুন।
- এক জোড়া জুতা প্রতিদিন না পরে একাধিক জোড়া পালা করে ব্যবহার করুন।
- দীর্ঘ সময় ভেজা মোজা বা জুতা পরে থাকা এড়িয়ে চলুন।
পায়ে অতিরিক্ত ঘাম হলে অ্যালুমিনিয়াম সল্টযুক্ত ঘামরোধক পদার্থ ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে পায়ের ত্বক সংবেদনশীল হলে, আগে থেকেই জ্বালাপোড়া থাকলে কিংবা ত্বকে ক্ষত থাকলে ব্যবহারের আগে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সব মিলিয়ে, পায়ের দুর্গন্ধ কমাতে শুধু পা পরিষ্কার রাখাই যথেষ্ট নয়। পা, মোজা ও জুতা শুকনো রাখাও জরুরি। পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস বজায় রাখার পরও দুর্গন্ধ না কমলে বা ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।



