‘আব্বু, আঙ্গুর খামু’—এক বাবার প্রবাসযাত্রার গল্প

এবার ফেরার সময় এয়ারপোর্টে আব্বাকে ছাড়া আর কাউকে সঙ্গে আনিনি। কেন আনিনি, তা আরেক গল্প।
আব্বাকে বিদায় দিয়ে এয়ারপোর্টের টার্মিনাল ২-এ ঢোকার জন্য সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছি। আমার সামনে এক ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। দুজনের হাত ধরা। বয়স ও অবস্থা দেখে বুঝলাম, তাঁরা নববিবাহিত। স্বামী চলে যাচ্ছেন প্রবাসে। অন্য আত্মীয়রা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছেন।
গেটে ঢোকার আগমুহূর্তে স্ত্রীকে বললেন, “শোন, একদম কাঁদবে না।” বলেই স্ত্রীর হাত ছেড়ে পেছনে না তাকিয়ে দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেলেন।
এদিকে স্ত্রীর বাঁধভাঙা কান্নার আওয়াজ শোনা গেল। তখন এক নারী আত্মীয়া এসে তাঁকে ধরে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন।
আমি ভেতরে ঢুকে দেখলাম, লোকটা দাঁড়িয়ে চোখ মুছছেন।
বুঝলাম, এই ভালোবাসার জন্যই পৃথিবী টিকে আছে।
তার আগে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখলাম আরও এক করুণ দৃশ্য।
এক ভদ্রলোকের কোল থেকে তাঁর তিন-চার বছর বয়সী কন্যা নামছেই না। মেয়ে কোনোভাবেই বাবাকে কোথাও যেতে দেবে না। বাবা যতই বোঝান—“আমি দুই দিন পরে চলে আসব, তোমার জন্য চকলেট আনব, খেলনা আনতে যাচ্ছি”—মেয়ে ততই আরও শক্ত করে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে।
কী কঠিন এক অবস্থা!
শেষমেশ মেয়েটির মা জোর করে তাকে বাবার কোল থেকে ছাড়িয়ে নিলেন।
আহা! সন্তানের মায়ার কী টান! নিজের মেয়েদের কথা মনে করে আমারও মন খারাপ হয়ে গেল।
যাক, শেষ পর্যন্ত ইমিগ্রেশন পার হয়ে বাংলাদেশ বিমানের সৌদিগামী ফিরতি ফ্লাইটে উঠলাম। আমার বাঁ পাশে দুজন যাত্রী বসা। সবাই মোটামুটি ক্লান্ত।
বিমানের লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
চারদিকে উজ্জ্বল আলোয় ঘুম ভাঙল। কেবিন ক্রুরা লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছেন। খাবার পরিবেশনের সময় হয়েছে। অল্প সময় পর কেবিন ক্রুরা খাবার পরিবেশন করলেন।
অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল খুলে সব প্রস্তুত করে যেই খাবার মুখে দিয়েছি, তখন পাশে বসা যাত্রী বলে উঠলেন—
“হেতাগো বাবুর্চি ফাল্টা হালাইছে।”
অর্থাৎ, “ওদের বাবুর্চি পাল্টে ফেলেছে।”
দেশে যাওয়ার সময় ফ্লাইটের খাবারের যে স্বাদ ছিল, এবার তিনি তা পাচ্ছেন না। তাঁর ধারণা, আগের বাবুর্চি আর নেই।
আর আমারও বুঝতে বাকি রইল না—He is from Noakhali.
এরপর অনেক কথা হলো। খাবার শেষে তিনি তাঁর প্রবাসজীবনের সংগ্রামের ইতিহাস শোনালেন। তবে তাঁর কয়েকটি কথা কলিজায় গেঁথে গেল। কথাগুলো আপনাদের সঙ্গে তাঁর ভাষাতেই শেয়ার করছি—
“আঁই সৌদি আরব আইতাম ছাই ন। আমার মেয়ের বয়স দেড় বছর। একটু একটু কথা বইলত ফারে। একদিন আমারে কইল, ‘আব্বু, আঙ্গুর খামু।’ কিন্তু আঙ্গুর কিনে দেওয়ার ফইসা তো আমার কাছে নাই। আমার কলিজা ছিঁড়ি গেল। আমি চিন্তা কইরলাম, এমনেতো চইলত ন। এই তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি বিদেশ যামু। কিন্তু আমার ফকেটে এক টেকা নাই। ধারদেনা করি ৪ দিনের ব্যবধানে ফাসফোর্ট করি, ভিসা একখান লই সৌদি আরব ছলি আইলাম। দুই বছর ফরে প্রথমবার দেশে যাই, মেয়ের মনমতো যা চাইছে কিনি দিছি, যা মনে চাইছে খাবাইছি, ঘুরাইছি।”
এ ছাড়া আরও অনেক কথা হলো।
বুঝলাম একজন পিতার ত্যাগ, সংগ্রাম আর আনন্দের কথা। তবে মনটা ভরে গেল এই ভেবে—
“I have traveled with a father. A sacrificed father.”
তখন আমার হুমায়ূন আহমেদের সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে হলো—
“পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু একটাও খারাপ পিতা নাই।”
নিজে পিতা হওয়ার পর এখন অনেক কিছু বুঝি।
পিতৃত্ব কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এটি এক ঐশ্বরিক অনুভূতি। পৃথিবীর কোনো কিছুতেই এর বিকল্প পাওয়া যায় না। পরম করুণাময় পিতৃত্ব সৃষ্টি করেছেন তাঁর নিজ গুণে।
হঠাৎ মনে হলো, আমার ঈমানের মাত্রা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
পৃথিবীর সকল পিতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
ঘটনা: ২০২৬ সালের



