প্রবাস

তুরস্কে বাংলাদেশিদের ভাগ্য বদলাবে?

প্রধানমন্ত্রীর সফরে প্রবাসীদের বড় প্রত্যাশা!

ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থল তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র নয়, বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাময় একটি বড় বাজার। দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফর তাই নতুন আশার বার্তা বহন করছে।

তাঁদের প্রত্যাশা—দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রবাসীদের জীবনমান উন্নয়ন, বৈধ কর্মসংস্থান, শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপদ অভিবাসনের বিষয়গুলোও যেন গুরুত্ব পায়।

তুরস্কে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জীবনযাত্রা একরকম নয়। সেখানে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, দক্ষ পেশাজীবী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমজীবী এবং অনিয়মিত অভিবাসন পরিস্থিতিতে থাকা বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন।

ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা ও অন্যান্য শহরে বাংলাদেশিদের বসবাস ও যোগাযোগ রয়েছে।

প্রবাসীদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে:

কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা: অনেকের জন্য উপযুক্ত চাকরি ও স্থায়ী কর্মসংস্থান পাওয়া কঠিন।

ভাষাগত সমস্যা: তুর্কি ভাষায় দক্ষতা না থাকায় চাকরি, ব্যবসা ও দৈনন্দিন যোগাযোগে বাধা তৈরি হয়।

বৈধ কাগজপত্র: ওয়ার্ক পারমিট ও বসবাসের অনুমতি সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে।

বেতন ও শ্রমিক অধিকার: বেতন, কর্মঘণ্টা, আবাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

কনস্যুলার সহায়তা: বিপদে পড়া, পাসপোর্ট হারানো, প্রতারণা কিংবা আইনি জটিলতায় দ্রুত দূতাবাসের সহায়তা পাওয়া প্রয়োজন।

তুরস্কের সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকদের কাজ শুরু করার আগে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট অথবা প্রযোজ্য ওয়ার্ক পারমিট অব্যাহতি নিতে হয়। শুধু রেসিডেন্স পারমিট থাকলেই কাজ করার অনুমতি পাওয়া যায় না।

তুরস্কের শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন ও উৎপাদন খাতে বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন বাংলাদেশিরা এসব ক্ষেত্রে সুযোগ খুঁজতে পারেন।

১. গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্প

তুরস্ক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ টেক্সটাইল ও পোশাক উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। এই খাতে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাব্য কাজের ক্ষেত্র:

  • গার্মেন্টস অপারেটর ও সুপারভাইজার।
  • কোয়ালিটি কন্ট্রোল কর্মকর্তা।
  • মার্চেন্ডাইজার।
  • টেক্সটাইল ডিজাইনার।
  • মেশিন অপারেটর ও টেকনিক্যাল কর্মী।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অভিজ্ঞতা তুরস্কের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দক্ষতা বিনিময় ও যৌথ উদ্যোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

২. নির্মাণ ও অবকাঠামো খাত

তুরস্কে নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবী ও কারিগরি কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে। যেমন:

  • ইলেকট্রিশিয়ান।
  • প্লাম্বার।
  • ওয়েল্ডার।
  • টাইলস ও মার্বেল মিস্ত্রি।
  • দক্ষ নির্মাণকর্মী।
  • সিভিল ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।

৩. হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও পর্যটন খাত

তুরস্কের পর্যটনশিল্পে বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাব্য কর্মক্ষেত্র রয়েছে। বিশেষ করে:

  • হোটেল ও রিসোর্ট কর্মী।
  • রেস্টুরেন্ট ও কিচেন কর্মী।
  • শেফ ও সহকারী শেফ।
  • হাউসকিপিং কর্মী।
  • কাস্টমার সার্ভিস কর্মকর্তা।

৪. খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষি খাত

খাদ্য উৎপাদন, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পেও দক্ষ কর্মীদের কাজের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব খাতে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় শ্রমবাজার ও ওয়ার্ক পারমিটের শর্ত পূরণ করতে হবে।

৫. তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাত

বাংলাদেশের দক্ষ আইটি পেশাজীবী, সফটওয়্যার ডেভেলপার, নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার, ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ এবং প্রযুক্তিবিদদের জন্যও সুযোগ অনুসন্ধানের ক্ষেত্র রয়েছে।

বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের ৩০ অক্টোবর বাংলাদেশের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী দুই দেশের বাণিজ্য ২ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি পর্যায়ে নেওয়ার লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

এ ছাড়া চামড়া, নন-লেদার পণ্য, জাহাজ নির্মাণ এবং তৈরি পোশাক খাতে তুরস্কের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর ইস্তাম্বুলে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর বৈঠকেও গুরুত্ব পেয়েছে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশি দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগ বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশিদের চাকরি নিশ্চিত হবে না; এ জন্য আলাদা শ্রমবাজার চুক্তি ও নিয়োগব্যবস্থা প্রয়োজন।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফর শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তাঁদের বাস্তব সমস্যা সমাধানের কার্যকর উদ্যোগে পরিণত হবে।

প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে যেসব দাবি ও প্রত্যাশা তুলে ধরা যেতে পারে:

১. বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা: তুরস্কের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শ্রমবাজার সহযোগিতা চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (MoU) করার উদ্যোগ নিতে হবে।

২. বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি: বাংলাদেশ থেকে সরকারিভাবে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা: প্রকৃত চাকরির চুক্তির ভিত্তিতে কর্মীদের ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।

৪. প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা: কর্মক্ষেত্রে বেতন না দেওয়া, প্রতারণা, নির্যাতন এবং চুক্তি ভঙ্গের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৫. বাংলাদেশি কমিউনিটি শক্তিশালী করা: ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারায় প্রবাসীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, আইনি পরামর্শ এবং জরুরি সহায়তা বাড়াতে হবে।

৬. দক্ষতা উন্নয়ন ও ভাষা প্রশিক্ষণ: বাংলাদেশে তুর্কি ভাষা, কারিগরি শিক্ষা এবং পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৭. বাংলাদেশিদের ব্যবসার সুযোগ: তুরস্কে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি ও বিনিয়োগে সহযোগিতা দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনে বাংলাদেশ এবং এ অঞ্চলের মানুষের সাফল্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ভবিষ্যতে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা সম্মেলনে উপস্থাপন করা হবে।

তিনি জানান, জলবায়ু তহবিল যেন ঋণ হিসেবে নয়, বরং অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়, সেটিই হবে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ অত্যন্ত কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের অন্যতম বড় ভুক্তভোগী বাংলাদেশ।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, কার্বন নিঃসরণে বড় দেশগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় যেসব দেশ বেশি দায়ী, তাদেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও সম্মেলনে তুলে ধরা হবে। প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, সৌরবিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এসব উদ্যোগ পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ভূমিকা রাখছে।

সরকারের এসব কার্যক্রম এবং জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের আঙ্কারাস্থ দূতাবাস ২০২৬ সালের জুনে তুরস্কে বসবাসরত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও শিল্পপেশাজীবীদের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিল। এটি প্রবাসীদের দক্ষতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ২০২৬ সালের ৯-২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় COP31 সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর ১১-১২ নভেম্বরের নেতৃবৃন্দের সম্মেলনে অংশগ্রহণের প্রত্যাশার কথা তুরস্কের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA), বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা চলছে।

এসব কূটনৈতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও অধিকার নিয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তুরস্কে বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনার পাশাপাশি নানা প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ জনশক্তি, বৈধ অভিবাসন এবং দুই দেশের সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা থাকলে তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে পরিণত হতে পারে।

প্রবাসীরা চান, প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক সফরে তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা গুরুত্ব পাক। শুধু বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নয়, প্রবাসীদের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার বিষয়েও কার্যকর সিদ্ধান্ত আসুক।

প্রবাসীদের মূল বার্তা একটাই-আমরা বিদেশে শুধু কাজ করতে চাই না, সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই। আমাদের শ্রমের মূল্য, নিরাপত্তা এবং বৈধ কর্মসংস্থানের অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখুক।

 

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button