
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে স্থানান্তর করা হচ্ছে বাংলাদেশ সচিবালয়। সেখানে ৩১ একর জমির ওপর নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন সচিবালয়ে ২০২৯ সালের মধ্যে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ সরকারের নিজস্ব পরিকল্পনার অংশ। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্ব দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নাসিমুল গণি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চান, সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর যেন আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
তবে নতুন সচিবালয় নির্মাণে মোট ব্যয় কত হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এ বিষয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
যা থাকছে নতুন সচিবালয়ে
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, নতুন সচিবালয়ের পরিকল্পনায় বেজমেন্টসহ তিন হাজার ৮০০টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া নির্মাণ করা হবে ১২ তলাবিশিষ্ট ১৪টি ভবন, দুটি মসজিদ, একটি বহুমুখী মিলনায়তন, ক্যাফেটেরিয়া ও ডাকঘর।
সচিবালয় এলাকায় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য কয়েকটি ভূগর্ভস্থ সড়ক ও আন্ডারপাস নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্তমান সচিবালয়ের জায়গা ভবিষ্যতে কী কাজে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ প্রসঙ্গে নাসিমুল গণি বলেন, পুরান ঢাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বিচারপ্রক্রিয়ার অনেক বিষয় আটকে রয়েছে। আদালতসহ এসব কার্যক্রম বর্তমান সচিবালয়ের জায়গায় স্থানান্তর করা হতে পারে। তবে সেখানে শেষ পর্যন্ত কী করা হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন
মন্ত্রিসভার বৈঠকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
এ ছাড়া ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আইন প্রণয়ন ও সংসদবিষয়ক বিভাগের যাচাই শেষে অধ্যাদেশটি কার্যকর করা হবে। সোমবারই এটি জারি হতে পারে বলে জানান নাসিমুল গণি।
সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি খাত কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও স্থাপনের বিষয়ে সরকার বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি জানান, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ভবনে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সুযোগ থাকবে। এ ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয়ভিত্তিক বা ওপেক্স মডেল এবং মূলধনি ব্যয়ভিত্তিক বা ক্যাপেক্স মডেল অনুসরণ করা হবে।
ওপেক্স মডেলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ পরিচালন ব্যয় বহন করবে। অন্যদিকে ক্যাপেক্স মডেলে মূলধনি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্প স্থাপন করা হবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে পরিচালিত হবে। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আইনি কাঠামো তৈরি করতেই অধ্যাদেশটি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
নাসিমুল গণি বলেন, কয়েক দফা আলোচনার পর অধ্যাদেশের খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে এটি সোমবার অধ্যাদেশ হিসেবে জারি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিপজ্জনক রাসায়নিক আমদানিতে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ
বৈঠকে বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত রটারডাম কনভেনশনে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে।
কনভেনশনটির পূর্ণ নাম ‘রটারডাম কনভেনশন অন দ্য প্রায়র ইনফর্মড কনসেন্ট প্রসিডিউর ফর সার্টেন হ্যাজার্ডাস কেমিক্যালস অ্যান্ড পেস্টিসাইডস ইন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’।
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আগেই তথ্য জানার সুযোগ তৈরি করাই এ কনভেনশনের মূল উদ্দেশ্য। এসব রাসায়নিকের সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে জেনে সংশ্লিষ্ট দেশ আমদানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তিনি বলেন, অনেক দেশ ইতিমধ্যে এ আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ এত দিন এর বাইরে ছিল। সরকার বিষয়টি পর্যালোচনা করে এখন কনভেনশনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বিপজ্জনক রাসায়নিক আমদানির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
জাতীয় সংসদ ভবনের নকশার মূল ধারণায় অনুমোদন
মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় সংসদ ভবনের নকশাসংক্রান্ত একটি প্রস্তাবের মূল ধারণাও অনুমোদন করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
তিনি বলেন, স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশার বৈশিষ্ট্য ও স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে নতুন কিছু সংযোজনের মাধ্যমে নকশাটি তৈরি করা হয়েছে। মূল নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নাসিমুল গণি বলেন, নকশা তৈরির কাজ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে মাস্টার প্ল্যান বা সামগ্রিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এরপর স্থাপত্য, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, পানি ও পয়োনিষ্কাশন এবং প্রকৌশল কাঠামোর বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন করা হয়। এসব কাজের জন্য আরও কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। সেগুলো এখনো সম্পন্ন হয়নি। আপাতত নকশার মূল ধারণায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং আরও কিছু বিষয় যাচাই করে পরবর্তী কাজ এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংসদ ভবনের স্থাপত্যশৈলীর গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, লুই আই কানের নকশা এখনো বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যকর্ম। বিদেশ থেকে অনেক মানুষ ও স্থাপত্যের শিক্ষার্থী সংসদ ভবন দেখতে আসেন। এ ভবনের স্থাপত্যশৈলী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্থাপত্যচর্চায়ও প্রভাব ফেলেছে।



