
শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে নির্দিষ্ট কোনো বয়সে ফিটনেসের চর্চা শুরু করতে হবে, এমন নয়। এ জন্য কঠিন ব্যায়াম বা কঠোর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করাও সব সময় জরুরি নয়। বরং নিয়মিত হাঁটা, পেশির শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম, সুষম খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুমের মতো অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ফিট থাকার জন্য সবার একই ধরনের ব্যায়াম বা খাদ্যাভ্যাস প্রয়োজন হয় না। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যের অবস্থা অনুযায়ী অভ্যাস গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের জীবনে কয়েকটি সহজ পরিবর্তন এনে শরীরকে সুস্থ ও সক্রিয় রাখা সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন পাঁচটি অভ্যাসের কথা।
১. প্রতিদিন হাঁটুন
শরীরচর্চা শুরু করার সহজ উপায়গুলোর একটি হলো হাঁটা। নিয়মিত হাঁটলে হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, অস্থিসন্ধির সচলতা বজায় রাখতে, মেজাজ উন্নত করতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যায়।
হাঁটার অভ্যাস বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুরুতেই নির্দিষ্টসংখ্যক পদক্ষেপ পূরণের চাপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের শারীরিক সক্ষমতা ও বর্তমান অভ্যাস অনুযায়ী হাঁটা শুরু করুন। পরে ধীরে ধীরে সময় ও দূরত্ব বাড়াতে পারেন।
২. পেশি ও হাড়ের শক্তি ধরে রাখতে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করুন
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির পরিমাণ ও হাড়ের ঘনত্ব কমে যেতে পারে। তবে নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করলে এ ধরনের ক্ষয় কমাতে সহায়তা পাওয়া যায়। তাই শরীরচর্চার রুটিনে ভার ব্যবহার করে বা শরীরের নিজস্ব ওজন কাজে লাগিয়ে ব্যায়াম রাখুন। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের ব্যায়াম পেশির ভর ও হাড়ের শক্তি বজায় রাখতে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। এতে শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম, ভারসাম্য ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা ভালো থাকতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে পড়ে যাওয়া ও আঘাতের ঝুঁকি কমাতেও পেশির শক্তি ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
এ জন্য ভারী ওজন তোলাই একমাত্র উপায় নয়। রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড, হালকা ডাম্বেল কিংবা নিজের শরীরের ওজন ব্যবহার করেও ব্যায়াম করা যায়। তবে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়াম বেছে নেওয়া এবং সঠিক পদ্ধতিতে তা করা জরুরি।
৩. খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ নিশ্চিত করুন
শরীরচর্চার পর পেশি পুনর্গঠন এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত প্রোটিন পেশি মেরামতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতেও সাহায্য করতে পারে, ফলে অপ্রয়োজনীয় খাবার খাওয়া বা অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ডাল ও বিভিন্ন ধরনের শিমজাতীয় খাবার থেকে প্রোটিন পাওয়া যায়। দিনে অন্তত দুই বেলার খাবারে প্রোটিনসমৃদ্ধ উপাদান রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
তবে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিনের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপর এ চাহিদা নির্ভর করে। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সুষম খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৪. ঘরে তৈরি খাবার বেশি খান
দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে ঘরে তৈরি খাবার খাওয়ার অভ্যাস উপকারী হতে পারে। বাড়িতে খাবার রান্না করলে কোন উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে, খাবারের পরিমাণ কতটা এবং কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
অন্যদিকে, নিয়মিত বাইরে খাওয়া বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভর করলে খাবারে ক্যালরি, চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বির পরিমাণ বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে সব বাইরের খাবারই অস্বাস্থ্যকর, এমন নয়। খাবারের উপকরণ ও রান্নার পদ্ধতিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ঘরে রান্না করার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী রেসিপিতে পরিবর্তন আনা যায়। শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমিয়ে আনার চেষ্টা করুন। এসব অভ্যাস ওজন এবং রক্তচাপসহ স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচক ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।
৫. ঘুমের অভ্যাস ঠিক করুন
শরীর সুস্থ রাখতে ব্যায়াম ও খাবারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমও জরুরি। ব্যস্ত জীবনযাপন, অনিয়মিত কাজের সময় কিংবা রাতে দীর্ঘক্ষণ মুঠোফোন ব্যবহারের কারণে অনেকের ঘুমের রুটিন ব্যাহত হয়। অথচ ঘুমের সময় শরীরের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া চলে, যা পেশির পুনর্গঠন, হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও মনোযোগ ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে।
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। শুধু ঘুমের সময় বাড়ানো নয়, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমের রুটিন ঠিক রাখতে রাতে ঘুমানোর আগে পরদিনের কাজের জন্য অ্যালার্ম সেট করে রাখতে পারেন। পাশাপাশি ঘুমের আগে একটি নির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করুন এবং এমন অভ্যাস এড়িয়ে চলুন, যা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের কর্মক্ষমতা এবং মানসিক সতেজতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
শরীর ফিট রাখতে একসঙ্গে অনেক পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন হাঁটা, সপ্তাহে নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়াম, সুষম খাবার এবং পর্যাপ্ত ঘুমের মতো অভ্যাস ধীরে ধীরে গড়ে তুলুন। ধারাবাহিকভাবে এসব অভ্যাস মেনে চললে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা সহজ হতে পারে। তবে ব্যায়াম শুরুর আগে কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।



