অন্য খবর

সারাক্ষণ ক্ষুধা লাগার পেছনে থাকতে পারে যে ৭ কারণ

খাবার খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর আবার ক্ষুধা লাগা স্বাভাবিক। শরীরের শক্তির চাহিদা পূরণে নিয়মিত খাবার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রম বেশি হলে ক্ষুধাও বাড়তে পারে। তবে পর্যাপ্ত খাবার খাওয়ার পরও যদি বারবার ক্ষুধা লাগে, তাহলে খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, মানসিক চাপ ও শারীরিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

ঘন ঘন ক্ষুধা লাগার অর্থ সব সময় এই নয় যে আপনি প্রয়োজনের তুলনায় কম খাচ্ছেন। কিছু অভ্যাস, জীবনযাপনের ধরন এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণেও ক্ষুধা বেড়ে যেতে পারে। তাই সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর সম্ভাব্য কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। চলুন জেনে নেওয়া যাক, সারাক্ষণ ক্ষুধা লাগার সাতটি সম্ভাব্য কারণ।

১. খাবারে প্রোটিন ও আঁশের ঘাটতি

খাবারে প্রোটিন ও আঁশের পরিমাণ কম হলে খাওয়ার কিছুক্ষণ পর আবার ক্ষুধা লাগতে পারে। পরিশোধিত শর্করাজাতীয় খাবার দ্রুত শক্তি জোগালেও অনেক ক্ষেত্রে তা দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে পারে না। অন্যদিকে, প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার তুলনামূলক বেশি সময় তৃপ্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।

ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, ডাল, শিমজাতীয় খাবার, দই ও বাদাম প্রোটিনের ভালো উৎস। শাকসবজি, ফল, পূর্ণশস্য, ডাল এবং বিভিন্ন বীজ থেকে পাওয়া যায় আঁশ।

শুধু সাদা ভাত, পরিশোধিত আটা দিয়ে তৈরি রুটি কিংবা হালকা নাশতার ওপর নির্ভর না করে খাবারে প্রোটিন ও শাকসবজি রাখার চেষ্টা করুন। যেমন রুটির সঙ্গে ডাল ও সবজি খাওয়া যেতে পারে। আবার পূর্ণশস্যের পাউরুটির সঙ্গে ডিমও হতে পারে তুলনামূলক সুষম খাবার।

২. পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া

ঘুমের ঘাটতি ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আগ্রহ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। ওবেসিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঘুমের সঙ্গে ক্ষুধা ও খাবার গ্রহণের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে দিনের বেলায় ক্ষুধা বেশি অনুভূত হতে পারে এবং উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণও বাড়তে পারে।

যাঁরা নিয়মিত কম ঘুমান, তাঁদের ঘন ঘন হালকা খাবার খাওয়ার ইচ্ছা হতে পারে। কখনো শরীরের অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন না থাকলেও এমন অনুভূতি দেখা দিতে পারে।

দিনভর কর্মক্ষম থাকতে শুধু খাবার বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে ঘুমের নিয়মিত রুটিন তৈরি করা জরুরি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।

৩. তৃষ্ণাকে ক্ষুধা মনে করা

কখনো কখনো ক্ষুধা বলে মনে হওয়া অনুভূতির পেছনে শরীরে পানির চাহিদাও থাকতে পারে। গরম আবহাওয়ায় কিংবা ব্যায়ামের পর এ ধরনের অনুভূতি দেখা দিতে পারে। মায়ো ক্লিনিকের তথ্যেও তৃষ্ণা ও ক্ষুধার অনুভূতির মধ্যে বিভ্রান্তি হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

খাবার খাওয়ার মাঝখানে হঠাৎ কিছু খেতে ইচ্ছা করলে প্রথমে পানি পান করে দেখতে পারেন। এতে অনুভূতিটি কমে কি না, খেয়াল করুন। তবে প্রকৃত ক্ষুধা উপেক্ষা করে শুধু পানি পান করা ঠিক নয়। পানি পান করার পরও ক্ষুধা থাকলে পুষ্টিকর খাবার বা নাশতা খান।

৪. পরিশোধিত শর্করাজাতীয় খাবার বেশি খাওয়া

চিনিযুক্ত পানীয়, মিষ্টি, বিস্কুট, পেস্ট্রি ও অন্যান্য পরিশোধিত শর্করাজাতীয় খাবার দ্রুত শক্তি জোগাতে পারে। কিন্তু এসব খাবার সব সময় দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে না। অ্যাপেটাইট সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাতেও খাবারের ধরন, তৃপ্তি ও ক্ষুধার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

দিনের বেশির ভাগ খাবার ও নাশতা যদি এ ধরনের খাবার দিয়ে তৈরি হয়, তাহলে বারবার ক্ষুধা লাগতে পারে। এর পরিবর্তে পূর্ণশস্য, শাকসবজি, ফল, ডাল ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখলে দীর্ঘ সময় তৃপ্ত থাকতে সহায়তা পাওয়া যায়।

তবে এর অর্থ শর্করাজাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দিতে হবে, এমন নয়। কী ধরনের খাবার খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং খাদ্যতালিকায় পুষ্টির ভারসাম্য আছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।

৫. মানসিক চাপ ও আবেগের কারণে খাওয়া

মানসিক চাপও ক্ষুধা ও খাওয়ার অভ্যাসে প্রভাব ফেলতে পারে। চাপের সময় শরীরে কর্টিসলের মতো হরমোনের নিঃসরণ পরিবর্তিত হয়। এর প্রভাবে কারও কারও ক্ষুধা বাড়তে পারে। আবার উদ্বেগ, একঘেয়েমি বা মন খারাপের মতো অনুভূতি সামলাতেও কেউ কেউ খাবারের আশ্রয় নেন।

এ ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে ক্ষুধা না লাগলেও খাওয়ার তাগিদ তৈরি হতে পারে। ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

তাই কখন এবং কী পরিস্থিতিতে খাওয়ার ইচ্ছা বাড়ছে, তা খেয়াল করুন। মানসিক চাপ, একঘেয়েমি বা আবেগের অস্থিরতার সময় বারবার খেতে ইচ্ছা করছে কি না, লক্ষ করুন। এমন হলে খাবারের পাশাপাশি মানসিক চাপ সামলানোর স্বাস্থ্যকর উপায় খুঁজে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

৬. শারীরিক পরিশ্রমের তুলনায় কম খাওয়া

ব্যায়ামের পরিমাণ বাড়ালে কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে বেশি সময় ব্যয় করলে শরীরের শক্তির চাহিদাও বাড়তে পারে। একই সময়ে খাবারের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দিলে ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক।

বিশেষ করে খেলোয়াড়, শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করেন এমন ব্যক্তি এবং কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণ অনুসরণকারীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার না খেলে ঘন ঘন ক্ষুধা লাগতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুধাকে উপেক্ষা না করে খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত শক্তি, প্রোটিন, আঁশ ও স্বাস্থ্যকর চর্বি আছে কি না, তা পর্যালোচনা করুন। অতিরিক্ত খাদ্যনিয়ন্ত্রণ শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণে বাধা দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাও কঠিন করে তুলতে পারে।

৭. কোনো শারীরিক অসুস্থতা

ক্রমাগত বা অস্বাভাবিকভাবে তীব্র ক্ষুধা কখনো কখনো শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। ইনসুলিনের ঘাটতি বা কার্যকারিতার সমস্যার কারণে রক্তের গ্লুকোজ শরীরের কোষে যথাযথভাবে ব্যবহার হতে না পারলে অতিরিক্ত ক্ষুধা দেখা দিতে পারে।

ক্ষুধা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, ক্লান্তি, ঝাপসা দৃষ্টি কিংবা চেষ্টা না করেও ওজন কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে পড়লেও ক্ষুধা বাড়তে পারে। এ অবস্থাকে হাইপারথাইরয়েডিজম বলা হয়। এতে শরীরের বিপাকক্রিয়া দ্রুত হয়ে যেতে পারে। এর অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে ব্যাখ্যাতীত ওজন কমে যাওয়া, দ্রুত হৃদস্পন্দন, অতিরিক্ত ঘাম, হাত কাঁপা, উদ্বেগ এবং ঘন ঘন মলত্যাগ।

এ ছাড়া কিছু ওষুধ, রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া এবং কিছু মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণেও ক্ষুধা বেড়ে যেতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা হলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

মাঝেমধ্যে ক্ষুধা লাগা স্বাভাবিক। তবে হঠাৎ ক্ষুধা বেড়ে গেলে, দীর্ঘদিন ধরে ঘন ঘন ক্ষুধা লাগলে কিংবা এর সঙ্গে অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

বিশেষ করে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, ব্যাখ্যাতীত ওজন কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দ্রুত হৃদস্পন্দনের মতো লক্ষণ থাকলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। সঠিক কারণ নির্ণয় করা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন বা চিকিৎসায় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button