
সংসার ও কর্মক্ষেত্রের নানা চাপ থেকে অনেকের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে তা ঘুম, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং দৈনন্দিন কাজের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য কিছুটা সময় রাখা জরুরি।
নিয়মিত শ্বাসের ব্যায়াম, ধ্যান ও হালকা শরীরচর্চা মানসিক চাপ সামলাতে এবং মন শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে। এসব অনুশীলনের জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না। কয়েকটি সহজ পদ্ধতি দিয়ে দিনের শুরু বা শেষটা করতে পারেন। তবে সবার ক্ষেত্রে একই অনুশীলন সমানভাবে কাজ নাও করতে পারে। জেনে নেওয়া যাক এমন পাঁচটি উপায়।
১. সিদ্ধাসন
যোগব্যায়ামের একটি পরিচিত আসন সিদ্ধাসন। এ আসনে মেরুদণ্ড সোজা রেখে আরাম করে বসতে হয়। মেঝেতে একটি ম্যাট বিছিয়ে পা ভাঁজ করে বসুন। যোগাসনের নিয়ম অনুযায়ী দুই পা এমনভাবে রাখুন, যাতে শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং অস্বস্তি না হয়।
এরপর দুই হাত হাঁটুর ওপর রাখুন। চাইলে জ্ঞানমুদ্রা করতে পারেন। এ মুদ্রায় তর্জনী ও বুড়ো আঙুলের ডগা একসঙ্গে স্পর্শ করিয়ে বাকি তিনটি আঙুল সোজা রাখতে হয়। এবার চোখ বন্ধ করে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন ও ছাড়ুন। কিছুক্ষণ এভাবে শান্ত হয়ে বসে থাকুন।
এ অনুশীলন মনোযোগ ধরে রাখতে এবং মনকে স্থির করতে সহায়তা করতে পারে। তবে হাঁটু বা কোমরে ব্যথা থাকলে জোর করে এভাবে বসবেন না। প্রয়োজনে চেয়ারে বসেও শ্বাসের অনুশীলন করতে পারেন।
২. বক্স ব্রিদিং
মানসিক চাপের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত ও অগভীর হয়ে যেতে পারে। বক্স ব্রিদিং বা নির্দিষ্ট ছন্দে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার অনুশীলন মনোযোগ ধরে রাখতে এবং শরীরকে শিথিল করতে সাহায্য করতে পারে।
এ পদ্ধতিতে শ্বাস নেওয়া, শ্বাস ধরে রাখা, শ্বাস ছাড়া এবং শ্বাস ছাড়ার পর বিরতি নেওয়া, প্রতিটি ধাপ সমান সময় ধরে করার চেষ্টা করা হয়। শুরুতে প্রতিটি ধাপ চার সেকেন্ড ধরে করতে পারেন।
প্রথমে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। এরপর চার সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন, চার সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখুন, চার সেকেন্ড ধরে শ্বাস ছাড়ুন এবং শ্বাস ছাড়ার পর চার সেকেন্ড বিরতি নিন। এভাবে কয়েকবার অনুশীলন করুন।
শ্বাস ধরে রাখতে কষ্ট হলে সময় কমিয়ে নিন কিংবা শ্বাস ধরে রাখার ধাপটি বাদ দিন। মাথা ঘোরা বা অস্বস্তি হলে অনুশীলন বন্ধ করে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন। জোর করে দীর্ঘ সময় শ্বাস ধরে রাখার প্রয়োজন নেই।
৩. ভস্ত্রিকা প্রাণায়াম
ভস্ত্রিকা প্রাণায়াম যোগব্যায়ামের একটি শ্বাসের অনুশীলন। এতে নিয়ন্ত্রিতভাবে তুলনামূলক জোরে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার চর্চা করা হয়। অনুশীলনের সময় মেরুদণ্ড সোজা রেখে আরাম করে বসতে হবে।
শুরুতে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন ও ছাড়ুন। এরপর প্রশিক্ষকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের সামর্থ্য বুঝে নিয়ন্ত্রিতভাবে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার অনুশীলন করুন। শ্বাসের গতি বা গভীরতা বাড়াতে গিয়ে শরীরে চাপ দেওয়া উচিত নয়। নতুনদের জন্য অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের কাছ থেকে পদ্ধতিটি শিখে নেওয়া ভালো।
কয়েক মিনিটের শ্বাসের অনুশীলন কিছু মানুষের মনোযোগ ও প্রশান্তি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে ভস্ত্রিকা প্রাণায়াম সবার জন্য উপযোগী নয়। হাঁপানি, হৃদ্রোগ, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া জোরে শ্বাস নেওয়ার এ অনুশীলন করা উচিত নয়। মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হবে।
৪. প্রাণমুদ্রা
প্রাণমুদ্রা যোগচর্চায় ব্যবহৃত একটি হাতের মুদ্রা। এ অনুশীলন করতে মেরুদণ্ড সোজা রেখে আরাম করে বসুন। দুই হাতের কনিষ্ঠা ও অনামিকা আঙুলের ডগা বুড়ো আঙুলের ডগার সঙ্গে স্পর্শ করান। তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল সোজা রাখুন।
এরপর দুই হাত হাঁটুর ওপর রেখে চোখ বন্ধ করুন। স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে ও ছাড়তে থাকুন। শুরুতে কয়েক মিনিট এভাবে বসে থাকতে পারেন। স্বচ্ছন্দ বোধ করলে সময় বাড়ানো যায়।
নীরবে বসে শ্বাসের দিকে মনোযোগ দেওয়া মানসিক প্রশান্তি ও মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে প্রাণমুদ্রা নিজে থেকেই স্নায়ুর সমস্যা সারায় বা ক্লান্তি দূর করে, এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
৫. চেস্ট ওপেনার স্ট্রেচ
দীর্ঘ সময় কম্পিউটারে কাজ করা বা একটানা বসে থাকার কারণে কাঁধ ও বুকের পেশিতে জড়তা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চেস্ট ওপেনার স্ট্রেচ বা বুক প্রসারিত করার ব্যায়াম কাজে আসতে পারে।
এ অনুশীলন করতে চেয়ারে পিঠ সোজা করে বসুন। কাঁধ স্বাভাবিক অবস্থায় রাখুন। এরপর দুই হাত পিঠের পেছনে নিয়ে এক হাত দিয়ে অন্য হাতের কবজি বা আঙুল ধরুন। এবার ধীরে ধীরে হাত পেছনের দিকে প্রসারিত করুন এবং বুক সামান্য সামনে খুলে দিন। কাঁধে বা পিঠে অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।
এ অবস্থায় ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন ও ছাড়ুন। এরপর হাত ছেড়ে আগের অবস্থায় ফিরে আসুন। প্রয়োজনে কয়েকবার করতে পারেন। এতে বুক ও কাঁধের পেশির টান কমতে এবং শরীর কিছুটা আরাম পেতে পারে।
তবে কাঁধ বা পিঠে ব্যথা থাকলে জোর করে হাত পেছনে টানবেন না। ব্যথা বা অস্বস্তি হলে অনুশীলন বন্ধ করুন।
নিয়মিত চর্চাই গুরুত্বপূর্ণ
মানসিক চাপ কমাতে এসব অনুশীলন দৈনন্দিন রুটিনে রাখা যেতে পারে। সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা সন্ধ্যায় কাজের ফাঁকে কয়েক মিনিট সময় বের করে নেওয়া সম্ভব। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার এবং কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাসও মানসিক সুস্থতায় ভূমিকা রাখে।
তবে দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ দীর্ঘস্থায়ী হলে, ঘুম ও দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটালে কিংবা তা সামলানো কঠিন হয়ে পড়লে শুধু এসব অনুশীলনের ওপর নির্ভর না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।



