প্রবাস

নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট আটকে রেখে হয়রানি করলে কি করবেন?

আপনার করণীয় কী?

বিদেশে চাকরি করতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি কর্মীকে একটি বড় সমস্যায় পড়তে হয়। নিয়োগকর্তা বা কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে তাঁদের মূল পাসপোর্ট নিজের কাছে রেখে দেয়। কখনো চাকরি ছাড়তে না দেওয়া, কখনো দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া, আবার কখনো ভিসা নবায়নের কথা বলে দীর্ঘদিন পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়।

এতে প্রবাসী কর্মীরা কর্মস্থল পরিবর্তন, দেশে ফেরা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে পরিচয়পত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। কিন্তু নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট আটকে রাখলেই যে কর্মীর কোনো প্রতিকার নেই, বিষয়টি এমন নয়। আন্তর্জাতিক শ্রমমান এবং বিভিন্ন দেশের আইনে এ বিষয়ে সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। জেনে নিন, বিদেশে নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট আটকে রাখলে কোথায় অভিযোগ করবেন এবং কীভাবে নিজের পাসপোর্ট ফেরত পাবেন।

নিয়োগকর্তা কি কর্মীর পাসপোর্ট আটকে রাখতে পারেন?

সাধারণভাবে একজন কর্মীর পাসপোর্ট তাঁর নিজের কাছে থাকার কথা। নিয়োগকর্তা নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য পাসপোর্ট রাখতে চাইলে কর্মীর প্রকৃত সম্মতি থাকা প্রয়োজন এবং কর্মী চাইলে যেকোনো সময় পাসপোর্ট ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) বলছে, অভিবাসী কর্মীদের পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র আটকে রাখা তাঁদের চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করে এবং জোরপূর্বক শ্রমের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই এ ধরনের চর্চাকে শ্রমিকের প্রতি অপব্যবহারমূলক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার ২০১২ সালের শ্রমিক নিয়োগসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের কর্মসংস্থান চুক্তির শর্তেও বলা হয়েছে, নিয়োগকর্তা কর্মীর পাসপোর্ট নিজের কাছে রাখতে পারবেন না। তবে কর্মীর লিখিত সম্মতিতে নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য রাখতে পারবেন এবং কর্মী সম্মতি প্রত্যাহার করলে পাসপোর্ট ফেরত দিতে হবে।

নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট আটকে রাখলে যে ৭টি কাজ করবেন

১. প্রথমে লিখিতভাবে পাসপোর্ট ফেরত চান

নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট ফেরত দিতে না চাইলে প্রথমে লিখিতভাবে পাসপোর্ট ফেরত চেয়ে আবেদন করুন। সম্ভব হলে ই-মেইল, মেসেজ বা লিখিত আবেদনের কপি সংরক্ষণ করুন।

কেন পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হচ্ছে না, সেটিও লিখিতভাবে জানতে চান।

২. বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইংয়ে অভিযোগ করুন

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রম কল্যাণ উইং গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার জায়গা।

নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট আটকে রাখলে সেখানে লিখিত অভিযোগ করতে পারেন।

অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত করুন:

  • পাসপোর্টের ফটোকপি।
  • ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের কপি।
  • চাকরির চুক্তিপত্র।
  • নিয়োগকর্তার নাম ও প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা।
  • পাসপোর্ট ফেরত চাওয়ার মেসেজ বা আবেদনের প্রমাণ।

দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

৩. সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করুন

নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট ফেরত না দিলে কর্মরত দেশের শ্রম মন্ত্রণালয় বা শ্রম অধিদপ্তরে অভিযোগ জানান।

বিভিন্ন দেশে অভিযোগের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ রয়েছে।

কর্তৃপক্ষ
কর্তৃপক্ষ

অভিযোগ করার সময় নিজের কর্মস্থল, নিয়োগকর্তার পরিচয় এবং পাসপোর্ট আটকে রাখার ঘটনার বিস্তারিত জানাতে হবে।

৪. প্রয়োজনে স্থানীয় পুলিশের সহায়তা নিন

নিয়োগকর্তা জোরপূর্বক পাসপোর্ট আটকে রাখলে, হুমকি দিলে কিংবা দেশে ফিরতে বাধা দিলে স্থানীয় পুলিশের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

বিশেষ করে পাসপোর্ট ফেরত চাওয়ার কারণে শারীরিক নির্যাতন, আটকে রাখা বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

৫. বাংলাদেশের সরকারি কর্তৃপক্ষকে জানান

বিদেশে পাসপোর্ট আটকে রাখার পাশাপাশি চাকরির চুক্তি লঙ্ঘন, প্রতারণা কিংবা রিক্রুটিং এজেন্সির অনিয়ম থাকলে বাংলাদেশের সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছেও অভিযোগ জানানো যায়।

গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ:

  • প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার: ১৬১৩৫
  • জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET): bmet.gov.bd
  • প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: probashi.gov.bd
  • ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড: wewb.gov.bd

বিদেশে অবস্থানরত কর্মী অথবা বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজন অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের সহায়তা চাইতে পারেন।

৬. পাসপোর্টের প্রমাণ ও অন্যান্য নথি সংরক্ষণ করুন

পাসপোর্ট আটকে রাখার ঘটনায় অভিযোগ প্রমাণ করতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাই নিজের কাছে রাখুন:

  • পাসপোর্টের ছবি বা ফটোকপি।
  • ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের কপি।
  • চাকরির চুক্তিপত্র।
  • নিয়োগকর্তার সঙ্গে কথোপকথনের স্ক্রিনশট।
  • পাসপোর্ট জমা দেওয়ার কোনো রসিদ।
  • পাসপোর্ট ফেরত চাওয়ার লিখিত আবেদনের কপি।

আরও পড়ুনঃ প্রবাসীদের বেতন আটকে রাখছে নিয়োগকর্তা? কোথায় অভিযোগ করবেন

৭. প্রয়োজন হলে আইনগত সহায়তা নিন

দূতাবাস ও শ্রম কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমাধান না হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী আইনজীবী বা আইনি সহায়তা সংস্থার পরামর্শ নিন।

তবে পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নতুন পাসপোর্টের আবেদন করবেন না। মূল পাসপোর্ট আটকে রাখার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানিয়ে পরবর্তী করণীয় জেনে নিন।

দেশভেদে পাসপোর্ট আটকে রাখার বিষয়ে কী নিয়ম রয়েছে?
কয়েকটি দেশের সরকারি নির্দেশনায় এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান পাওয়া যায়।

সৌদি আরব: দেশটির মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের (MHRSD) ২০২৫ সালের নির্দেশিকায় কর্মীর পাসপোর্ট আটকে রাখাকে লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে Beneficiary Page-এর মাধ্যমে অভিযোগ করার কথা বলা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত: দেশটির Federal Decree-Law No. 33 of 2021-এর ১৩(২) ধারায় নিয়োগকর্তার কর্মীর সরকারি নথি আটকে রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

সিঙ্গাপুর: Ministry of Manpower (MOM) নিয়োগকর্তাদের কর্মীদের পাসপোর্ট আটকে না রাখার নির্দেশ দিয়েছে। কর্মীরা পাসপোর্ট ফেরত না পেলে MOM-এর সহায়তা নিতে পারেন।

মালয়েশিয়া: বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমিক নিয়োগ চুক্তিতে কর্মীর সম্মতি ছাড়া নিয়োগকর্তার পাসপোর্ট সংরক্ষণ না করার শর্ত রয়েছে।

তবে এসব দেশের নিয়ম এক নয়। কর্মীর চাকরির ধরন ও অভিবাসন পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিযোগের প্রক্রিয়াও ভিন্ন হতে পারে।

শুধু পাসপোর্ট আটকে রাখার ঘটনাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানবপাচার বা জোরপূর্বক শ্রম প্রমাণ করে না। তবে এর সঙ্গে যদি আরও কিছু ঘটনা যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে।

যেমন:

  • পাসপোর্ট ফেরত চাইলে চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি।
  • দেশে ফিরতে চাইলে বাধা দেওয়া।
  • জোর করে কাজ করানো।
  • বেতন আটকে রেখে কর্মস্থল ছাড়তে না দেওয়া।
  • কর্মীকে ভয়ভীতি দেখানো বা শারীরিক নির্যাতন করা।
  • অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত দূতাবাস, স্থানীয় পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট শ্রম কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া জরুরি।

বিদেশে চাকরি করতে গিয়ে পাসপোর্ট হারানো বা আটকে রাখার মতো পরিস্থিতিতে নীরব থাকবেন না। নিজের পাসপোর্টের কপি, ভিসা, চাকরির চুক্তিপত্র এবং নিয়োগকর্তার তথ্য সব সময় সংরক্ষণ করুন।

প্রয়োজনে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইং এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি শ্রম দপ্তরের সহায়তা নিন।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button