সুদখোর পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া কি জায়েজ?

ইসলামে বিয়ে শুধু দুটি মানুষের পারিবারিক বন্ধন নয়; এটি একটি পবিত্র আমানত এবং দ্বীন, চরিত্র ও নৈতিকতা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে একজন অভিভাবকের দায়িত্ব হলো এমন পাত্র নির্বাচন করা, যিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা ও হালাল উপার্জনের প্রতি যত্নবান।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো ব্যক্তি যদি সুদের কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে তাঁর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া কি শরিয়তসম্মত? এ ধরনের বিয়ে কি বৈধ হবে? সুদি উপার্জনকারী ব্যক্তির সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করলে মেয়ের কোনো ধর্মীয় সমস্যা হবে কি?
তবে বিয়ের প্রস্তাব আসার পর যদি জানা যায়, পাত্রের উপার্জনের সঙ্গে সুদ বা হারাম লেনদেন জড়িত, তখন স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় পড়েন। এমন ব্যক্তির কাছে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া কি ইসলামে বৈধ? তার উপার্জন হারাম হলে স্ত্রীর জীবনেও কি এর প্রভাব পড়বে? পাত্রের চরিত্র ভালো হলেও সুদি কারবারে জড়িত থাকলে অভিভাবকদের করণীয় কী?
ইসলামের বিধান অনুযায়ী এসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রত্যেক মুসলিম অভিভাবকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
১. সুদের ব্যাপারে ইসলামের কঠোর নিষেধাজ্ঞা
ইসলামে সুদ সম্পূর্ণ হারাম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সুদ ও ব্যবসার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে বলেছেন—
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
অর্থ: ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৫)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সুদের অবশিষ্ট অংশ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
অর্থ: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৮)
এমনকি সুদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ব্যাপারেও রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষীকে অভিশাপ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তারা সবাই গুনাহের ক্ষেত্রে সমান। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
অতএব, সুদি লেনদেনকে সাধারণ কোনো ব্যবসা বা পেশা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইসলামে এটি গুরুতর কবিরা গুনাহ।
২. সুদি কারবারে জড়িত পাত্রের কাছে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া যাবে?
এ বিষয়ে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি সুদের সঙ্গে জড়িত থাকা এবং তার সঙ্গে বিবাহবন্ধনের বৈধতা এক বিষয় নয়।
শুধু সুদি কারবারে জড়িত থাকার কারণে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায় না। তবে তার উপার্জন ও দ্বীনদারি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।
বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি সুদকে হারাম জানার পরও যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সুদি লেনদেনে জড়িত থাকেন এবং তা থেকে ফিরে আসতে আগ্রহী না হন, তাহলে তাকে পাত্র হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া উচিত।
আরও পড়ুনঃ বিয়ে কিংবা দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি গুনাহ?
শাইখ ইবনে বায (রহ.)-এর কাছে এক ব্যক্তির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল, যিনি সুদভিত্তিক ব্যাংকে চাকরি করতেন। তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলার পরও তিনি বিকল্প চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এমন ব্যক্তির কাছে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া যাবে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে শাইখ ইবনে বায (রহ.) ওই চাকরিতে থাকা অবস্থায় তার কাছে মেয়েকে বিয়ে না দেওয়ার পরামর্শ দেন।
এ থেকে বোঝা যায়, পাত্রের উপার্জনের উৎসকে অবহেলা করা উচিত নয়। অভিভাবকদের উচিত তাকে সুদি কারবার থেকে ফিরে এসে হালাল উপার্জনের পথ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া।
৩. পাত্র নির্বাচনে অর্থ-সম্পদের চেয়ে দ্বীনদারি গুরুত্বপূর্ণ
বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্রের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করা স্বাভাবিক। তবে শুধু অর্থসম্পদ, ভালো চাকরি, বাড়ি কিংবা সামাজিক মর্যাদা দেখে জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা উচিত নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ
অর্থ: ‘তোমাদের কাছে এমন কেউ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তাহলে তার সঙ্গে বিয়ে দাও।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৪)
এই হাদিসে পাত্রের দ্বীনদারি ও উত্তম চরিত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাই বিয়ের আগে পাত্রের নামাজের অভ্যাস, ধর্মীয় অনুশীলন, সততা, দায়িত্ববোধ, হালাল-হারামের প্রতি সচেতনতা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার আচরণ সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
সুতরাং একজন মুসলিমের উচিত নিজের উপার্জন হালাল রাখা এবং হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকা।
তবে স্বামীর আয়ের কোনো অংশ হারাম হলেই স্ত্রীর ভোগ করা প্রতিটি খাবার বা সংসারের সব সম্পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। অর্থের উৎস, উপার্জনের ধরন এবং স্ত্রীর নিজস্ব ভূমিকার ওপর এ বিষয়ে শরয়ি বিধান নির্ভর করতে পারে।
৪. পাত্র সুদি কারবার ছাড়তে না চাইলে অভিভাবকদের করণীয়
কোনো পাত্র যদি সুদি লেনদেনে জড়িত থাকেন এবং বারবার বোঝানোর পরও তা ছাড়তে আগ্রহী না হন, তাহলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
কারণ সংসারজীবনে শুধু আর্থিক সচ্ছলতা যথেষ্ট নয়। স্বামীর ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং হালাল-হারাম মেনে চলার মানসিকতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা পাত্রের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেন। তিনি সুদকে হারাম মনে করেন কি না, কেন এই পেশায় রয়েছেন এবং ভবিষ্যতে হালাল উপার্জনের ব্যবস্থা করার বিষয়ে তার কোনো আন্তরিক পরিকল্পনা আছে কি না, তা জানা প্রয়োজন।
কেবল মুখের আশ্বাস নয়, তার বাস্তব আচরণ ও পরিবর্তনের আগ্রহও যাচাই করা উচিত।
৫. সুদি কারবার ছেড়ে তওবা করলে কি বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করা যাবে?
কোনো ব্যক্তি অতীতে সুদি কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকলেও পরে যদি আন্তরিকভাবে তওবা করেন, সেই কাজ ছেড়ে দেন এবং হালাল উপার্জনের পথে ফিরে আসেন, তাহলে শুধু অতীতের কারণে তাকে সারাজীবনের জন্য অযোগ্য মনে করা উচিত নয়।
ইসলামে তওবার দরজা সব সময় খোলা। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
অর্থ: ‘বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।’ (সুরা আয-যুমার, আয়াত: ৫৩)
তাই কোনো পাত্র আন্তরিকভাবে সুদি কারবার ছেড়ে দিয়ে হালাল উপার্জনের চেষ্টা শুরু করলে এবং তার মধ্যে দ্বীনদারি, সততা ও দায়িত্বশীলতা পাওয়া গেলে তার বিয়ের প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে।
৬. মেয়ের মতামত ও সম্মতিকে গুরুত্ব দিতে হবে
মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে শুধু অভিভাবকদের পছন্দই যথেষ্ট নয়। মেয়ের নিজের মতামত ও সম্মতিকেও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ
অর্থ: ‘পূর্বে বিবাহিত নারীকে তার পরামর্শ ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং কুমারী মেয়েকেও তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৩৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪১৯)
সুতরাং পাত্রের দ্বীনদারি, চরিত্র ও উপার্জন যাচাইয়ের পাশাপাশি মেয়ের পছন্দ ও সম্মতিও নিশ্চিত করতে হবে। কোনোভাবেই তাকে অনিচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়েতে বাধ্য করা উচিত নয়।
সুদি কারবারে জড়িত ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ নয়। তবে সুদ যে ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, তা জানার পরও যে ব্যক্তি এতে জড়িত থাকেন এবং তওবা করে ফিরে আসতে চান না, তাকে পাত্র হিসেবে গ্রহণ না করাই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে, কোনো ব্যক্তি যদি আন্তরিকভাবে তওবা করে সুদি কারবার ছেড়ে দেন, হালাল উপার্জনের পথে ফিরে আসেন এবং তার দ্বীনদারি ও চরিত্র সন্তোষজনক হয়, তাহলে তার বিয়ের প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে।
মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবনের কথা চিন্তা করে অভিভাবকদের উচিত পাত্রের অর্থসম্পদের পাশাপাশি তার ধর্মীয় মূল্যবোধ, সততা, দায়িত্বশীলতা এবং উপার্জনের উৎস যাচাই করা।
কারণ একজন মেয়ের জন্য শুধু বিত্তশালী স্বামী নয়, বরং দ্বীনদার, সৎ, দায়িত্বশীল ও হালাল উপার্জনে আগ্রহী জীবনসঙ্গীই অধিক কাম্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের জন্য নেককার জীবনসঙ্গী নির্বাচন করার তৌফিক দান করুন এবং সুদসহ সব ধরনের হারাম উপার্জন ও লেনদেন থেকে হেফাজত করুন।



