
সৌদি আরবে চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। হত্যা, মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদসংশ্লিষ্ট অপরাধে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে। তবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান বলছে, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধে। এ ধরনের অপরাধে দণ্ডিত ৭১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ ছাড়া হত্যা মামলায় ২৫ জন এবং হত্যা না থাকা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট মামলায় ৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
বার্তা সংস্থা এএফপির সরকারি ঘোষণাভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে এ বছর ১৮৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ১৮ অক্টোবর পাঁচ সৌদি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরও সামনে এসেছে।
মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বেশি
ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার (ইএসওএইচআর) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে মোট ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৭১ জন মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধে, ২৫ জন হত্যা মামলায়, ৯ জন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট অপরাধে এবং তিনজন অন্যান্য অপরাধে দণ্ডিত ছিলেন। অর্থাৎ, ওই ছয় মাসে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৬৬ শতাংশই ছিল মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধে।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৯ জন বিদেশি নাগরিক এবং ৪৯ জন সৌদি নাগরিক ছিলেন। মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গত ২২ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সে সময় পর্যন্ত সৌদি আরবে ৯৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৬১ জন মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধে দণ্ডিত ছিলেন। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে অন্তত ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
কোন অপরাধে কী শাস্তি
সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা শরিয়াহভিত্তিক বিধান, লিখিত আইন এবং রাজকীয় আদেশের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। অপরাধের ধরন, প্রমাণ, পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইনি বিধানের ওপর শাস্তি নির্ভর করে। ফলে সব অপরাধের জন্য একই ধরনের শাস্তি নির্ধারিত নয়।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাদক পাচার করে সৌদি আরবে প্রবেশ করানো এবং বিদেশ থেকে মাদক এনে বিতরণের মতো অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। মাদক বিক্রির ক্ষেত্রে প্রথমবার অপরাধের জন্য কারাদণ্ড, জরিমানা কিংবা অন্য শাস্তি দেওয়া হতে পারে। একই অপরাধ আবার করলে শাস্তি আরও কঠোর হতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া সম্ভব।
ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে কিসাসের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। এ বিধান অনুযায়ী, আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া সম্ভব। তবে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা আইনি শর্ত মেনে ক্ষমা করলে বা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করলে মামলার পরিণতি পরিবর্তিত হতে পারে।
সন্ত্রাসবাদ, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তার মতো গুরুতর অপরাধেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ সৌদি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগ দেওয়া, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গুলি চালানো এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগ ছিল।
অন্যদিকে, চুরি, প্রতারণা, মদ বা মাদক সেবনসহ অন্যান্য অপরাধের শাস্তি অপরাধের ধরন ও প্রযোজ্য আইনের ওপর নির্ভর করে। এসব অপরাধে কারাদণ্ড ও জরিমানাসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি হতে পারে। তবে চুরির মতো নির্দিষ্ট অপরাধে শরিয়াহর বিশেষ শর্ত পূরণ হলে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ
সৌদি আরবে ব্যাপক হারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংস্থাটি সব ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে।
ইএসওএইচআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১০৮ জনের মধ্যে ৮৩ জনের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ ছিল না। সংস্থাটির মতে, এ পরিসংখ্যান সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
তবে এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের অবস্থান ভিন্ন। দেশটির সরকার জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার উপায় হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে বিবেচনা করে। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, আপিলের সব আইনি সুযোগ শেষ হওয়ার পরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।



