
রাতের বেলা মন খারাপ হওয়া অনেকের কাছেই পরিচিত অভিজ্ঞতা। দিনের বেলায় কাজকর্ম, মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা কিংবা নানা ব্যস্ততার মধ্যে হয়তো ভালোই কাটে সময়। কিন্তু রাতে একা হলেই হঠাৎ ভর করতে পারে দুঃখ, উদ্বেগ কিংবা মনমরা ভাব। এমন অভিজ্ঞতা হলেই যে কারও বিষণ্ণতা রয়েছে, তা নয়।
রাতের নিস্তব্ধতা, দিনের ক্লান্তি, একাকীত্ব, ঘুমের অনিয়ম এবং অতিরিক্ত চিন্তা মনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। রাতে নিয়মিত মন খারাপ হলে নিজেকে দোষারোপ না করে কখন এবং কী কারণে এমন অনুভূতি হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
দিনের বেলায় কাজ, কথাবার্তা ও অন্যান্য ব্যস্ততা মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। রাতে এসব ব্যস্ততা কমে গেলে দুশ্চিন্তা, অতীতের কোনো ঘটনা নিয়ে অনুশোচনা কিংবা অমীমাংসিত সমস্যার কথা বেশি মনে পড়তে পারে। ফলে নেতিবাচক চিন্তা আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
এ ছাড়া শরীরের নিজস্ব ২৪ ঘণ্টার ছন্দ রয়েছে, যাকে বলা হয় দেহঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম। এটি ঘুম, হরমোনের কার্যক্রম এবং মেজাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। দিনের শেষে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি বেড়ে গেলে আবেগ সামলানোও কঠিন হতে পারে। রাতে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও মেলামেশা কমে যাওয়ায় কারও কারও একাকীত্বের অনুভূতিও বাড়ে।
রাতের মন খারাপ সামলাতে কিছু অভ্যাস কাজে আসতে পারে।
১. ঘুমানোর আগে নিজেকে শান্ত হওয়ার সময় দিন
কাজ, ঘরের দায়িত্ব কিংবা মানসিক চাপ তৈরি করে এমন কথাবার্তার পরপরই বিছানায় যাওয়ার পরিবর্তে কিছুটা সময় নিজের জন্য রাখুন। ঘুমানোর আগের শেষ ৩০ থেকে ৬০ মিনিট শান্তভাবে কাটানোর চেষ্টা করুন। এ সময় গোসল করা, বই পড়া, হালকা গান শোনা কিংবা মুঠোফোন থেকে দূরে বসে থাকার মতো কাজ করতে পারেন। এতে দিনের ব্যস্ততা থেকে ঘুমের প্রস্তুতিতে যাওয়ার জন্য মন কিছুটা সময় পাবে।
২. মাঝরাতে বসে জীবনের সব সমস্যার সমাধান করতে যাবেন না
রাতে অতিরিক্ত চিন্তা করার সময় ছোট সমস্যাও অনেক বড় বলে মনে হতে পারে। কোনো দুশ্চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকলে সেটি কাগজে লিখে রাখতে পারেন। পরদিন কী কী করতে হবে, তা নিয়েও ছোট একটি তালিকা তৈরি করুন। এরপর আপাতত বিষয়টি নিয়ে ভাবা বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করুন।
এর অর্থ সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়া নয়। বরং শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত থাকার সময় প্রতিটি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে গিয়ে নিজেকে আরও চাপে না ফেলা।
৩. ঘুমানোর ও ঘুম থেকে ওঠার সময় নিয়মিত রাখুন
প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক দেহঘড়ি ঠিক রাখতে সাহায্য করে। ঘুমের ধরন ও দেহঘড়ির সঙ্গে মেজাজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় ঘুমের অনিয়মিত অভ্যাসের সঙ্গে মানসিক সুস্থতা কমে যাওয়া এবং বিষণ্ণতার উপসর্গ বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাই ছুটির দিনেও ঘুমের সময়সূচিতে খুব বেশি পরিবর্তন না আনার চেষ্টা করুন। নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস রাতে মন খারাপের প্রবণতা সামলাতে সহায়ক হতে পারে।
৪. মন খারাপ করে এমন বিষয় স্ক্রল না করে শান্ত কিছু করুন
ঘুমানোর আগে নেতিবাচক খবর, অনলাইন তর্ক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্যদের বেছে প্রকাশ করা জীবনের ঝলমলে মুহূর্ত দেখতে থাকলে কারও কারও মন আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে অন্যদের জীবনের সঙ্গে নিজের পরিস্থিতির তুলনা করলে হতাশা বাড়তে পারে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের মধ্যে ছোট হলেও তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সমস্যাজনক মাত্রায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সমস্যা ও মানসিক সুস্থতা কমে যাওয়ার সম্পর্কও দেখা গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলেই মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে। বরং খেয়াল করুন, রাতে স্ক্রল করার পর আপনার মেজাজ কেমন থাকে। এতে মন খারাপ বাড়লে ঘুমানোর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কমিয়ে বই পড়া, হালকা গান শোনা কিংবা অন্য কোনো শান্ত কাজে সময় দিতে পারেন।
৫. একা লাগলে পরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলুন
মন খারাপের সময় সব সমস্যার সমাধান করতে হবে, এমন নয়। অনেক সময় বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে সামান্য কথা বলাও একাকীত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে। রাতে একা লাগলে বন্ধু, পরিবারের সদস্য কিংবা কাছের কাউকে ফোন বা বার্তা পাঠাতে পারেন।
সারাদিন কেমন কাটল, তা নিয়ে কথা বলা, একসঙ্গে কোনো অনুষ্ঠান দেখা কিংবা শুধু একে অন্যের খোঁজখবর নেওয়াও কাজে আসতে পারে। উদ্দেশ্য একবারের কথোপকথনেই সব সমস্যার সমাধান করা নয়, বরং অন্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং একাকীত্বের অনুভূতি কিছুটা কমানো।
রাতে মাঝেমধ্যে মন খারাপ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এমন অনুভূতি নিয়মিত হতে থাকলে, দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে কিংবা ঘুম, কাজ ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। নিজেকে দোষারোপ না করে নিজের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা চাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।



