প্রবাস

বিদেশে চাকরির স্বপ্ন দেখছেন? দালালের এই ৮ ফাঁদে পড়লেই সর্বস্ব হারাবেন

বিদেশে  চাকরি, ভালো বেতন আর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশে। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার এই স্বপ্নকে পুঁজি করে সক্রিয় রয়েছে প্রতারক ও মানবপাচারকারী চক্র।

আকর্ষণীয় বেতনের চাকরি, ফ্রি ভিসা, সরকারি নিয়োগ কিংবা ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে অনেকের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। কেউ বিদেশে গিয়েও চাকরি পাচ্ছেন না, কেউ আটকা পড়ছেন অজানা স্থানে, আবার কেউ পড়ছেন জোরপূর্বক শ্রম ও মানবপাচারের ঝুঁকিতে। বিদেশে যাওয়ার আগে প্রতারণার ৮টি পরিচিত কৌশল এবং সেগুলো থেকে বাঁচার উপায় জেনে রাখা জরুরি।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগের সংখ্যা ২০২৩ সালে ছিল ২ হাজার ৩৮০টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ২১৩টিতে। এসব ঘটনা বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিদেশে যাওয়ার আগে কয়েকটি সাধারণ প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে জানা থাকলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ও বিপদ এড়ানো সম্ভব।

বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার ৮টি পরিচিত কৌশল

১. ফ্রি ভিসার প্রলোভন

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ‘ফ্রি ভিসা’ দেওয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু এ ধরনের ভিসার ক্ষেত্রে অনেক সময় নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার অধীনে কাজের সুযোগ থাকে না। বিদেশে গিয়ে নিজের কাজ ও থাকার ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়।

এতে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে জরিমানা, আটক কিংবা দেশে ফেরত পাঠানোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন কর্মীরা।

২. সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের (BOESL) নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তি ছড়ানো হয়। এসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা, এমনকি মেডিকেল পরীক্ষা ও আঙুলের ছাপের নামে বিভিন্ন তথ্যও সংগ্রহ করা হতে পারে।

তাই সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি যাচাই করতে বোয়েসেলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট boesl.gov.bd এবং ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ অনুসরণ করতে হবে। অপরিচিত কোনো ব্যক্তি বা পেজের দেওয়া বিজ্ঞপ্তি দেখে টাকা পাঠানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

৩. অস্বাভাবিক বেতনের লোভনীয় চাকরির প্রস্তাব

‘কোনো অভিজ্ঞতা লাগবে না, ইন্টারভিউ ছাড়াই মাসে ৮০০ ডলার বেতন’—এমন আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখলে সতর্ক হওয়া জরুরি।

কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের কিছু এলাকায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশিদের নিয়ে গিয়ে আটকে রাখার ঘটনা ঘটেছে। পরে তাদের দিয়ে অনলাইন প্রতারণা ও বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড করানো হয়।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতজনের মাধ্যমে প্রস্তাব পেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়েছেন।

৪. ভিজিট বা ট্যুরিস্ট ভিসায় চাকরির প্রতিশ্রুতি

অনেক দালাল দাবি করেন, প্রথমে ভিজিট বা ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশে যেতে হবে। সেখানে পৌঁছানোর পর সহজেই কাজের ভিসা করে দেওয়া হবে।

এ ধরনের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে বিদেশে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ ভিজিট ভিসায় সাধারণত চাকরি করার অনুমতি থাকে না। কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে যথাযথ কর্মভিসা ও বিএমইটির প্রয়োজনীয় বহির্গমন ছাড়পত্র নিশ্চিত করা জরুরি।

৫. সাধারণ চাকরির কথা বলে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ঝুঁকি

বিদেশে রাঁধুনি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা সাধারণ শ্রমিকের চাকরির প্রলোভন দেখিয়েও প্রতারণার ঘটনা সামনে এসেছে।

বিশেষ করে রাশিয়ায় সামরিক স্থাপনায় সাধারণ কাজের কথা বলে নিয়ে গিয়ে কয়েকজন বাংলাদেশিকে রুশ ভাষায় সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ ও খবর প্রকাশিত হয়েছে।

তাই বিদেশি ভাষায় লেখা কোনো চুক্তিপত্রের অর্থ না বুঝে কখনো স্বাক্ষর করা উচিত নয়। চাকরির ধরন, নিয়োগকর্তা ও চুক্তির শর্ত ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।

৬. লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার প্রলোভন

ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে দালালচক্র অনেক বাংলাদেশিকে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার বিপজ্জনক সমুদ্রপথে পাঠানোর চেষ্টা করে।

এই পথে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, শারীরিক নির্যাতন ও প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। তাই কোনো দালাল ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা দিলেও এমন প্রস্তাবে রাজি হওয়া উচিত নয়।

৭. রসিদ ছাড়া নগদ টাকা নেওয়া

বিদেশে চাকরির জন্য অনেকেই দালাল বা এজেন্সিকে নগদ টাকা দিয়ে থাকেন। কিন্তু টাকা দেওয়ার পর লিখিত রসিদ, চুক্তিপত্র কিংবা যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ করেন না।

পরবর্তী সময়ে প্রতারণার শিকার হলে টাকা ফেরত পাওয়া বা অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি লেনদেনের লিখিত রসিদ এবং ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে।

৮. লাইসেন্সবিহীন দালাল ও এজেন্সি

বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের দেওয়া চাকরির প্রস্তাব যাচাই করা কঠিন।

আরও পড়ুনঃ প্রবাসে কাজের প্রলোভনে শ্রমিক শোষণ

২০২৩ সালের আইনি সংশোধনের পর সাব-এজেন্টদের নিবন্ধনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার আগে তাদের বৈধ লাইসেন্স ও নিবন্ধন যাচাই করতে হবে।

বিদেশে যাওয়ার আগে যেভাবে এজেন্সি, চাকরি ও ভিসা যাচাই করবেন

শুধু এজেন্সির অফিস, সাইনবোর্ড কিংবা দালালের পরিচয় দেখে বিশ্বাস করা উচিত নয়। বিদেশে যাওয়ার আগে সরকারি তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই করা যায়।

১. রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স যাচাই

বিএমইটির অধীন Recruiting Agents’ Information Management System (RAIMS)-এ গিয়ে এজেন্সির RL নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করুন।

ওয়েবসাইট: raims.oep.gov.bd/agencies

যাচাই করার সময় খেয়াল রাখুন:

এজেন্সির নাম ও RL নম্বর মিলছে কি না।

লাইসেন্সের অবস্থা Active, Suspended, Expired নাকি Cancelled।

লাইসেন্সের মেয়াদ রয়েছে কি না।

ওয়েবসাইটে দেওয়া ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য বাস্তব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলছে কি না।

মনে রাখবেন, লাইসেন্স Active থাকলেই এজেন্সির প্রতিটি চাকরির প্রস্তাব বৈধ বা নিরাপদ প্রমাণিত হয় না। নির্দিষ্ট চাকরি ও নিয়োগের অনুমোদনও যাচাই করতে হবে।

২. চাকরির চাহিদাপত্র ও নিয়োগকর্তা যাচাই

সরকারের Overseas Employment Platform (OEP)-এ বিদেশি নিয়োগকর্তা, চাকরির চাহিদা, কর্মী নিবন্ধন ও বহির্গমন ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।

ওয়েবসাইট: oep.gov.bd

OEP-এর প্রক্রিয়ায় বিদেশি নিয়োগকর্তার চাকরির চাহিদা জমা দেওয়া এবং বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে নিয়োগকর্তা, চাকরির চাহিদা ও ভিসা যাচাইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

তাই বিদেশে যাওয়ার আগে নিজের চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগকর্তা ও ভিসার তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত করুন।

৩. ভিসার সত্যতা যাচাই

যে দেশে যাচ্ছেন, সেই দেশের সরকারি ইমিগ্রেশন বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ভিসার তথ্য যাচাই করুন।

সৌদি আরব: visa.mofa.gov.sa

সংযুক্ত আরব আমিরাত: smartservices.icp.gov.ae

দুবাই: gdrfad.gov.ae

কাতার: moi.gov.qa

ভিসার নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি পোর্টালে যাচাই করুন। ভিসার ধরন কাজের অনুমতি দেয় কি না, সেটিও নিশ্চিত হতে হবে।

৪. বিএমইটি বহির্গমন ছাড়পত্র নিশ্চিত করুন

বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় বিএমইটি নিবন্ধন, প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণ (PDO) এবং বহির্গমন ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন।

OEP-এর মাধ্যমে কর্মীর নিবন্ধন থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ, মেডিকেল, ভিসা এবং Emigration Clearance Card সংগ্রহের প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়।

ওয়েবসাইট: employee.oep.gov.bd

প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়া বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন না।

প্রতারণার শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করবেন?

বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার শিকার হলে চুপ করে না থেকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রথমেই টাকা দেওয়ার রসিদ, নিয়োগপত্র, চুক্তিপত্র, মোবাইলের মেসেজ, কলের তথ্য এবং ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের প্রমাণ সংগ্রহ করে রাখুন।

এরপর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রবাসবন্ধু কল সেন্টারের ১৬১৩৫ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন। বিএমইটির কাছেও অনলাইনে অথবা সরাসরি অভিযোগ জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিএমইটির মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি ও সালিশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গুরুতর প্রতারণার ক্ষেত্রে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩ এবং মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৮৬৫টি অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছিল।

বিদেশে যাওয়ার আগে এই ১০টি বিষয় নিশ্চিত করুন

বিদেশে চাকরির জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিচের বিষয়গুলো যাচাই করে নিন।

  • এজেন্সির বৈধ RL লাইসেন্স যাচাই করেছেন।
  • নিয়োগকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা নিশ্চিত করেছেন।
  • চাকরির পদ ও কাজের ধরন লিখিতভাবে পেয়েছেন।
  • মাসিক বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যাচাই করেছেন।
  • কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি ও ওভারটাইমের শর্ত বুঝেছেন।
  • ভিসার ধরন ও বৈধতা যাচাই করেছেন।
  • মোট অভিবাসন ব্যয়ের লিখিত হিসাব নিয়েছেন।
  • প্রতিটি লেনদেনের রসিদ সংরক্ষণ করেছেন।
  • চুক্তিপত্র পড়ে বুঝে স্বাক্ষর করেছেন।
  • বিএমইটির প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও বহির্গমন ছাড়পত্র নিশ্চিত করেছেন।

মনে রাখবেন, বিদেশে চাকরির প্রলোভনে তাড়াহুড়ো করে টাকা দেওয়া আপনার জীবনের বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই দালালের প্রতিশ্রুতি নয়, সরকারি যাচাই ও বৈধ কাগজপত্র নিশ্চিত করেই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিন।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button