Businessআন্তর্জাতিক

দুই বছরের মধ্যে স্বর্ণের দামে নতুন রেকর্ডের পূর্বাভাস

বিশ্ববাজারে আগামী দুই বছরের মধ্যে স্বর্ণের দাম আবারও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছেন বিনিয়োগকারীরা। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন ডলারের ওপর আস্থা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে বলে তাঁদের ধারণা। এরই মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ কেনার পরিমাণ প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার বিশ্ববাজারে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ২ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৭৫ ডলারে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে, এমন প্রত্যাশার কারণে স্বর্ণের দামে এই পতন ঘটে। তবে কয়েকজন তহবিল ব্যবস্থাপকের ধারণা, সাম্প্রতিক দরপতনের পরও স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৬৩ টন স্বর্ণ কিনেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর কোনো এক মাসে স্বর্ণ কেনার পরিমাণ এটিই সর্বোচ্চ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব তৈরি করেছে সংস্থাটি।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৫০০ ডলারের বেশি উঠে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছিল। এরপর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে ঐতিহাসিক বিবেচনায় স্বর্ণের দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক ও আর্থিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এসব পরিস্থিতি স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী রাখতে পারে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস আয়োজিত মূল্যবান ধাতুবিষয়ক এক সম্মেলনে ট্রয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তহবিল ব্যবস্থাপক শার্লট ইয়ং বলেন, আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।

শার্লট ইয়ংয়ের মতে, সরকারি অর্থব্যবস্থার অবনতিশীল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সোনা কার্যকর সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবারও অর্থ সরবরাহ বাড়াতে পারে। তবে কাগুজে মুদ্রার মতো স্বর্ণ ইচ্ছেমতো তৈরি করা সম্ভব নয়।

অয়ন ইনভেস্টমেন্টসের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের প্রতিনিধি প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা পল কার্নও আগামী দুই বছরের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ডে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দিয়েছেন।

তাঁর মতে, ডলারকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে বিভিন্ন দেশ ও বিনিয়োগকারী এর বিকল্প খুঁজতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে স্বর্ণ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

স্বর্ণখনি প্রতিষ্ঠান অ্যালায়েড গোল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী পিটার মারোনে বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি নতুন কোনো আর্থিক সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে কি না, তা বিনিয়োগকারীদের বিবেচনা করা উচিত।

তাঁর ভাষ্য, বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের কোনো আর্থিক ঘটনার দ্বারপ্রান্তে থাকতে পারে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিভিন্ন পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সরকারি বন্ড থেকে অর্থ সরিয়ে স্বর্ণে বিনিয়োগ করছে।

স্বর্ণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এন্ডেভার মাইনিংয়ের প্রধান নির্বাহী ইয়ান ককারিল বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রচলিত মুদ্রার ওপর আস্থা কমে যাওয়া এবং নিজস্ব মুদ্রার মূল্য ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর উদ্বেগ স্বর্ণের দামের পক্ষে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে।

তবে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ডলারকে সর্বনিম্ন সীমা হিসেবে ধরে রাখা যাবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন ইয়ান ককারিল। তাঁর ধারণা, স্বর্ণের দামে পরবর্তী ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হওয়ার আগে দাম এই স্তরের কাছাকাছি থাকতে পারে।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পণ্যবাজারবিষয়ক গবেষণা বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান সুকি কুপার বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণের চাহিদা এখনো শক্তিশালী রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর কিছু দেশ অর্থের প্রয়োজন মেটাতে স্বর্ণ বিক্রিও করেছে।

শার্লট ইয়ংয়ের মতে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মার্কিন ডলারের বিকল্প মজুত মুদ্রা খুঁজছে। এ ক্ষেত্রে ইউরো বা জাপানি ইয়েনের তুলনায় স্বর্ণের প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, মার্কিন ডলারের ওপর আস্থা কমে গেলে এবং বিকল্প সম্পদের চাহিদা বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবারও স্বর্ণ কেনার পরিমাণ বাড়াতে পারে।

বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়না সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও স্বর্ণের মজুত বাড়িয়েছে। দেশটির মোট বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে স্বর্ণের অংশ এখন প্রায় ৯ শতাংশ। পরিমাণের হিসাবে চীনের স্বর্ণের মজুত প্রায় ২ হাজার ৪১০ টন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button