অন্য খবর

গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি পান করা কি নিরাপদ?

গ্রিন টি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ পানীয়। হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখা ও বিপাকক্রিয়ায় সম্ভাব্য উপকারের কারণে অনেকেই নিয়মিত এটি পান করেন। সাধারণ চা বা কফির তুলনায় গ্রিন টি বেশি স্বাস্থ্যকর, এমন ধারণাও প্রচলিত। তবে গর্ভাবস্থায় খাবার ও পানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। সাধারণ সময়ে যে পানীয় উপকারী বলে বিবেচিত হয়, গর্ভাবস্থায় সেটি গ্রহণের আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে জানা জরুরি।

গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি পান করা যায়, তবে পরিমাণের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এতে থাকা ক্যাফেইন এবং ফোলেটের শোষণ ও ব্যবহারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি পান করার বিশেষ উপকারিতা নিয়ে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি কি উপকারী?

গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি পান করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। তবে এর স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর সবই গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গ্রিন টি-তে ক্যাটেচিন নামের একধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। সাধারণ মানুষের ওপর পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য ও বিপাকক্রিয়ার সঙ্গে এর সম্ভাব্য উপকারের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এসব গবেষণার অধিকাংশই গর্ভবতী নারীদের ওপর পরিচালিত হয়নি। ফলে গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি পান করলে একই ধরনের উপকার পাওয়া যায় কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

গ্রিন টি দৈনিক তরল গ্রহণের পরিমাণ বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে এটি একমাত্র বিকল্প নয়। পানি ও গর্ভাবস্থায় উপযোগী অন্যান্য পানীয় থেকেও শরীরের প্রয়োজনীয় তরল পাওয়া সম্ভব।

সব মিলিয়ে, গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি পানের বিশেষ উপকারিতার পক্ষে প্রমাণ সীমিত। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় নিয়ে এটি পরিমিত পরিমাণে পান করা উচিত।

গ্রিন টি-তে থাকা ক্যাফেইন কি উদ্বেগের কারণ?

গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি পান করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ক্যাফেইন। গ্রিন টি-তে কতটা ক্যাফেইন থাকবে, তা চায়ের ধরন, পরিমাণ এবং তৈরির পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ (এনএইচএস) গর্ভবতী নারীদের দিনে মোট ২০০ মিলিগ্রামের বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ না করার পরামর্শ দেয়। এই হিসাবের মধ্যে শুধু গ্রিন টি নয়, দিনের সব খাবার ও পানীয় থেকে গ্রহণ করা ক্যাফেইন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ক্যাফেইনের উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • গ্রিন টি ও কালো চা
  • কফি
  • কোলা ও এনার্জি ড্রিংকস
  • চকোলেট
  • ক্যাফেইনযুক্ত কিছু ওষুধ ও সম্পূরক।

তাই দিনে কত কাপ গ্রিন টি পান করছেন, শুধু সেটি হিসাব করলেই হবে না। অন্যান্য খাবার ও পানীয় থেকে কতটা ক্যাফেইন গ্রহণ করছেন, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

রিপ্রোডাক্টিভ টক্সিকোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ক্যাফেইন গ্রহণের সঙ্গে গর্ভাবস্থার বিভিন্ন ফলাফলের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ক্যাফেইন প্লাসেন্টা বা অমরার মধ্য দিয়ে গর্ভস্থ শিশুর কাছে পৌঁছাতে পারে। অমরা মায়ের শরীর থেকে শিশুর কাছে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিভিন্ন গবেষণায় ক্যাফেইন গ্রহণের সঙ্গে কম ওজন নিয়ে শিশুর জন্ম এবং গর্ভপাতের ঝুঁকির সম্পর্ক দেখা হয়েছে। তবে এসব সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে ক্যাফেইন গ্রহণ করলেই এমন সমস্যা হবে। গবেষণার ফল ব্যাখ্যা করার সময় ক্যাফেইনের পরিমাণ, অন্যান্য ঝুঁকির কারণ এবং গবেষণার সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় নিতে হয়।

কিছু গবেষণায় দৈনিক ২০০ মিলিগ্রামের কম ক্যাফেইন গ্রহণের ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। তবে এ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে ক্যাফেইনের কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি কমাতে ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই ভালো।

গ্রিন টি কি ফোলেটের শোষণে বাধা দেয়?

গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে ফোলেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের প্রাথমিক গঠন, বিশেষ করে নিউরাল টিউব তৈরিতে এই পুষ্টি উপাদান ভূমিকা রাখে। নিউরাল টিউবের গঠনে ত্রুটি দেখা দিলে শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের গুরুতর জন্মগত সমস্যা হতে পারে।

গ্রিন টি-তে থাকা ক্যাটেচিনসহ কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগ শরীরে ফোলেটের প্রাপ্যতা, শোষণ বা বিপাকপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এ কারণে গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে গ্রিন টি পান করার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ সময় শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ফোলেট পাওয়া বিশেষভাবে জরুরি।

তবে এ বিষয়ে প্রাপ্ত প্রমাণের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মাত্রাভিত্তিক বিশ্লেষণে গর্ভধারণের সময় চা পান এবং নিউরাল টিউবের জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকির সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়। এতে চা পানের কারণে এ ধরনের ত্রুটি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, গ্রিন টি পান করলেই শিশুর নিউরাল টিউবের ত্রুটি হবে, এমন দাবি সঠিক নয়। একই সঙ্গে ফোলেটের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থায় ফোলেটের চাহিদা পূরণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিন টি পান করলেও ফলিক অ্যাসিডের বিকল্প হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা যাবে না।

গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি পান করলে কী মনে রাখবেন?

গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি পান করতে চাইলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, চা থেকে পাওয়া ক্যাফেইনের পাশাপাশি কফি, চকোলেট, কোমল পানীয় ও অন্যান্য উৎস থেকে গ্রহণ করা ক্যাফেইনের পরিমাণও হিসাব করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্রিন টি-কে বিশেষ স্বাস্থ্যগত উপকার পাওয়ার উপায় হিসেবে না দেখে সাধারণ পানীয় হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

বিশেষ করে গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে ফোলেটের প্রয়োজনীয়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড গ্রহণে গুরুত্ব দিতে হবে। গর্ভাবস্থায় ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে চিকিৎসক পানীয় গ্রহণের বিষয়ে আলাদা পরামর্শ দিতে পারেন।

সব মিলিয়ে, গর্ভাবস্থায় গ্রিন টি পরিমিত পরিমাণে পান করা যেতে পারে। তবে এতে থাকা ক্যাফেইনের পরিমাণ হিসাব করা জরুরি। পাশাপাশি গ্রিন টি-এর সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি এড়িয়ে চলা এবং মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button