অন্য খবর

নিয়মিত কফি পান করার ৫ উপকারিতা

বিশ্বজুড়েই জনপ্রিয় পানীয় কফি। দিনের শুরুতে এক কাপ কফি পান করলে অনেকেরই ঘুম ঘুম ভাব কাটে, মনোযোগ বাড়ে এবং ক্লান্তি কম অনুভূত হয়। কফিতে থাকা ক্যাফেইন মূলত এ ধরনের প্রভাবের জন্য দায়ী। তবে কফির সম্ভাব্য উপকারিতা শুধু সাময়িকভাবে সতেজ বোধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন গবেষণায় নিয়মিত কফি পানের সঙ্গে টাইপ ২ ডায়াবেটিস, কিছু স্নায়বিক রোগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ওজন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও এর সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে কফি সরাসরি উপকারের কারণ কি না, তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

১. ক্লান্তি কমিয়ে সতর্কতা বাড়ায়

কফিতে থাকা ক্যাফেইন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে। মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন নামের একটি রাসায়নিকের কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে ক্যাফেইন ঘুম ঘুম ভাব কমাতে এবং সতর্কতা বাড়াতে সাহায্য করে। এর ফলে অনেকেই কফি পান করার পর তুলনামূলক বেশি সজাগ ও কর্মক্ষম বোধ করেন।

কিছু গবেষণায় শারীরিক ব্যায়ামের সময়ও ক্যাফেইনের উপকার পাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাফেইন গ্রহণের পর সাইক্লিংয়ের সময় অংশগ্রহণকারীরা ক্লান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ১২ শতাংশ বেশি সময় ব্যায়াম করতে পেরেছিলেন। তাঁরা ক্লান্তিও তুলনামূলক কম অনুভব করেছিলেন। তবে ক্যাফেইনের প্রভাব ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। অতিরিক্ত কফি পান করলে ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা বা বুক ধড়ফড় করার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

২. টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে

বিভিন্ন গবেষণায় নিয়মিত কফি পান করার সঙ্গে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ৩০টি গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিদিন কফি পানের পরিমাণ প্রতি এক কাপ বাড়ার সঙ্গে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৬ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে।

কফির কিছু উপাদান শরীরের বিপাকপ্রক্রিয়া ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ ইনসুলিন তৈরি করে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কফির কিছু উপাদান এসব প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

তবে গবেষণায় পাওয়া সম্পর্ক থেকেই বলা যায় না যে কফি পান করলেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। রোগটির ঝুঁকির সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, ওজন ও বংশগতির মতো বিষয়ও জড়িত। তাই কফিকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের কোনো নিশ্চিত উপায় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।

৩. মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে

কফি ও ক্যাফেইন নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় আলঝেইমার রোগ, পারকিনসন রোগ ও ডিমেনশিয়ার মতো স্নায়বিক সমস্যার সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে। কিছু গবেষণায় নিয়মিত ক্যাফেইন গ্রহণকারীদের মধ্যে পারকিনসন রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

১৩টি গবেষণার একটি পর্যালোচনাতেও ক্যাফেইন গ্রহণের সঙ্গে পারকিনসন রোগের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক দেখা যায়। কিছু গবেষণায় রোগটির অগ্রগতির সঙ্গেও ক্যাফেইন গ্রহণের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রমাণ এখনো নিশ্চিত নয়।

পরিমিত কফি পানের সঙ্গে ডিমেনশিয়া ও মস্তিষ্কের কিছু সমস্যার ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্কও কয়েকটি গবেষণায় উঠে এসেছে। কিন্তু কফি এসব রোগ প্রতিরোধ করে বা রোগের অগ্রগতি ধীর করে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।

৪. ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে

কফি ও শরীরের চর্বির পরিমাণের সম্পর্ক নিয়ে কিছু গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণায় কফি পানের সঙ্গে শরীরের চর্বি কম থাকার সম্ভাব্য যোগসূত্র পাওয়া গেছে। ১২টি গবেষণার একটি পর্যালোচনায় বেশি কফি পানের সঙ্গে শরীরের চর্বি কম থাকার সম্পর্ক দেখা যায়, বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে। অন্য একটি গবেষণায় নারীদের মধ্যে কফি পানের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে শরীরের চর্বি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

ক্যাফেইন সাময়িকভাবে বিপাকের হার ও শারীরিক কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা প্রতিদিন এক থেকে দুই কাপ কফি পান করেন, তাঁদের শারীরিক কার্যকলাপের প্রস্তাবিত মাত্রা পূরণের সম্ভাবনা, যাঁরা দিনে এক কাপের কম কফি পান করেন তাঁদের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি ছিল।

তবে এসব ফলাফল থেকে কফি পান করলেই ওজন বা শরীরের চর্বি কমবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কফির সঙ্গে চিনি, সিরাপ, ক্রিম বা অন্যান্য উচ্চ ক্যালরির উপকরণ যোগ করলে পানীয়টির ক্যালরিও বেড়ে যায়। ওজন নিয়ন্ত্রণে খাবারের পরিমাণ, খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৫. বিষণ্নতার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে

কিছু গবেষণায় কফি পানের সঙ্গে বিষণ্নতার ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা প্রতিদিন অন্তত চার কাপ কফি পান করেন, তাঁদের মধ্যে প্রতিদিন মাত্র এক কাপ কফি পানকারীদের তুলনায় বিষণ্নতার ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক ছিল।

ক্যাফেইন সতর্কতা ও মেজাজে সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কফি পান বিষণ্নতা প্রতিরোধ করে বা এর চিকিৎসা হিসেবে কাজ করে, এমন প্রমাণ নেই। গবেষণায় পাওয়া সম্পর্কের পেছনে ঘুম, জীবনযাপন, শারীরিক স্বাস্থ্য ও অন্যান্য বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে।

বিষণ্নতার উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে চিকিৎসক কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কফিকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

কফি পরিমিত পরিমাণে পান করলে অনেকের জন্য এটি দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা, ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলে পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। কফি পান করার সময় চিনি ও ক্রিমের পরিমাণ কম রাখাও ভালো।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button