
ঘুম শুধু শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার সময় নয়। ঘুমের মধ্যেই মস্তিষ্ক দিনের নানা তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে, স্মৃতি সংরক্ষণে কাজ করে এবং শরীরের কোষ ও কলার মেরামতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়া চলতে থাকে। অথচ অনেক প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিদিন রাতে মাত্র ছয় ঘণ্টা ঘুমান। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, এই সময়ের ঘুমেই শরীর অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিয়মিত ছয় ঘণ্টা ঘুম কি সত্যিই যথেষ্ট?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নিয়মিত ছয় ঘণ্টা ঘুম পর্যাপ্ত নয়। সুস্থ থাকার জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে বয়স অনুযায়ী ঘুমের প্রয়োজন বদলায়। প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা এবং সাত বা আট ঘণ্টা ঘুমের পার্থক্য তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও দীর্ঘদিন ধরে শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুম স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বয়স অনুযায়ী কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন?
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুমের প্রয়োজন এক রকম থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) সুপারিশ অনুযায়ী, বয়সভেদে ঘুমের প্রয়োজনীয় সময় হলো:
- ০ থেকে ৩ মাস: দিনে ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা।
- ৪ থেকে ১২ মাস: দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা।
- ১ থেকে ২ বছর: দিনে ১১ থেকে ১৪ ঘণ্টা।
- ৩ থেকে ৫ বছর: দিনে ১০ থেকে ১৩ ঘণ্টা।
- ৬ থেকে ১২ বছর: দিনে ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা।
- ১৩ থেকে ১৭ বছর: দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা।
- ১৮ থেকে ৬০ বছর: রাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা।
- ৬১ থেকে ৬৪ বছর: সাধারণত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা।
- ৬৫ বছর বা তার বেশি: সাধারণত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা।
শিশুদের ক্ষেত্রে এসব সময়ের মধ্যে দিনের ঘুমও অন্তর্ভুক্ত। বয়স ছাড়াও ব্যক্তিভেদে ঘুমের প্রয়োজন কিছুটা আলাদা হতে পারে। তবে অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নিয়মিত ছয় ঘণ্টা ঘুম প্রস্তাবিত সময়ের চেয়ে কম।
কেন ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়েও যথেষ্ট মনে হতে পারে?
নিয়মিত কম ঘুমানোর পরও অনেকের মনে হতে পারে, তাঁদের তেমন ক্লান্তি লাগছে না। এর একটি কারণ হলো শরীরের অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া। কেউ প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা ঘুমালে একপর্যায়ে এই সময়ের ঘুমকেই স্বাভাবিক বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু ক্লান্তি কম অনুভব করার অর্থ এই নয় যে শরীরের আর ঘুমের প্রয়োজন নেই। অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে মনোযোগ, স্মৃতি বা কাজের দক্ষতায় যে পরিবর্তন আসে, তা সব সময় নিজের কাছে স্পষ্ট নাও হতে পারে।
অবশ্য ব্যতিক্রমও রয়েছে। কিছু মানুষের মধ্যে বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যার কারণে তাঁরা স্বাভাবিকের তুলনায় কম ঘুমিয়েও ভালোভাবে কাজ করতে পারেন। তাঁদের স্বল্পঘুমী ব্যক্তি বলা হয়। তবে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত ছয় ঘণ্টা ঘুমানোর ফলে প্রয়োজনীয় ঘুমের সঙ্গে প্রাপ্ত ঘুমের একটি ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
ঘুমের সময়কাল ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাও হয়েছে। স্লিপ অ্যান্ড ব্রিদিং সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ৬৯টি মেটা-বিশ্লেষণের ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়। এতে ঘুমের অপর্যাপ্ত বা অনুপযুক্ত সময়ের সঙ্গে হৃদ্রোগ, স্মৃতিশক্তির অবনতি, বিষণ্নতা, বিপাকীয় সিনড্রোম ও স্ট্রোকের মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া যায়। কিছু বিশ্লেষণে কম ঘুমের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার সম্পর্কও দেখা গেছে।
তবে এসব গবেষণায় পাওয়া সম্পর্ক মানেই কম ঘুম সরাসরি সব রোগের কারণ, এমন নয়। ব্যক্তির বয়স, জীবনযাপন, আগে থেকে থাকা অসুস্থতা এবং ঘুমের গুণগত মানের মতো বিষয়ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিদিন মাত্র ছয় ঘণ্টা ঘুমালে কী হতে পারে?
কম ঘুমের প্রভাব সব সময় সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমালে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:
মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে নতুন তথ্য শেখা, মনে রাখা এবং কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হওয়া: ঘুমের ঘাটতি বিচারবোধ ও প্রতিক্রিয়ার গতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি গাড়ি চালানো বা যন্ত্র পরিচালনার মতো কাজেও ভুলের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মেজাজের পরিবর্তন: কম ঘুমের কারণে বিরক্তি, অস্থিরতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিনের ঘুমের সমস্যার সঙ্গে বিষণ্নতারও সম্পর্ক রয়েছে।
উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি: নিয়মিত অপর্যাপ্ত ঘুম উচ্চ রক্তচাপসহ হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালিসংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিপাকীয় সমস্যা: ঘুমের ঘাটতি শরীরের বিপাকপ্রক্রিয়া ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ওজন বাড়ার আশঙ্কা: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে ক্ষুধা বাড়া এবং খাবার গ্রহণের ধরন বদলে যাওয়ার মাধ্যমে ওজন বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় প্রভাব: নিয়মিত কম ঘুম শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে। এতে সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিক্রিয়াও প্রভাবিত হতে পারে।
এ ধরনের সমস্যা সবার ক্ষেত্রে একইভাবে দেখা দেয় না। কত দিন ধরে কম ঘুম হচ্ছে, ঘুমের মান কেমন এবং ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য কেমন, তার ওপর প্রভাবের ধরন ও মাত্রা নির্ভর করে।
ঘুমের ঘাটতি এড়াতে কী করবেন?
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী। ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত চা-কফি পান, ভারী খাবার গ্রহণ এবং মুঠোফোন বা অন্যান্য পর্দার ব্যবহার কমানো যেতে পারে। শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখলেও ঘুমে সুবিধা হয়।
প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিত অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমানোর লক্ষ্য রাখা উচিত। তবে শুধু ঘুমের সময় বাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান হবে না, ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও নিয়মিত ক্লান্তি থাকলে, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে বা জোরে নাক ডাকা ও ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে আসার মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা ঘুমকে যথেষ্ট ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম সুস্থতা বজায় রাখা, মনোযোগ ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।



