
আর কোনো মায়ের সন্তান যেন এভাবে হত্যার শিকার না হয়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুন। তিনি বলেছেন, দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরাই কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। তাই কোনো ক্যাম্পাসে যেন আগের মতো সহিংস পরিবেশ ফিরে না আসে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘প্রত্যেক ক্যাম্পাসের ছেলেমেয়েই আমার মতো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। আমি চাই, কোনো ক্যাম্পাসেই যেন আর আগের মতো পরিবেশ ফিরে না আসে। আমার মতো কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।’
সাক্ষাতে আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ প্রধানমন্ত্রীকে বুয়েট ক্যাম্পাস পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানান। পাশাপাশি বুয়েটে আবরার ফাহাদের নামে একটি নতুন হল নির্মাণের দাবি জানান তিনি। তাঁর এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষা সচিবের সঙ্গে কথা বলেন।
নতুন প্রজন্মের কাছে আবরার ফাহাদের ঘটনা তুলে ধরতে পাঠ্যবইয়েও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান আবরার ফাইয়াজ।
এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারের উদ্যোগে জুলাই আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের তালিকা করা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আবরার ফাহাদের মতো যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদেরও একটি তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে একটি প্রকল্প মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রকল্পটি নিয়ে কাজ চলছে।
সাক্ষাতের সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির উপস্থিত ছিলেন।
যেভাবে হত্যা করা হয় আবরারকে
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামে।
হত্যাকাণ্ডের আগের দিন, ৫ অক্টোবর ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে আবরার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে সই হওয়া কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতার সমালোচনা করেন। মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ, ফেনী নদীর পানি এবং গ্যাস রপ্তানির মতো বিষয় নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পরদিন রাতে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা তাঁকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে ডেকে নিয়ে ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে আবরার অচেতন হয়ে পড়লে তাঁকে হলের সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয়। ময়নাতদন্তে অতিরিক্ত মারধরের কারণে তাঁর শরীরে গুরুতর আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের শাস্তিসহ ১০ দফা দাবি জানান।
মামলার রায় ও বর্তমান অবস্থা
আবরার হত্যার ঘটনায় ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর তাঁর বাবা বরকত উল্লাহ চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের ওই রায় বহাল রাখেন।
পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামিও লিভ টু আপিল করেন। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।



