বিদেশযাত্রায় বাধা, সাড়ে পাঁচ বছরে ফেরত ৮১ হাজার যাত্রী!
জাল ভিসা, দালালের প্রতারণা ও ইমিগ্রেশন হয়রানি—বিপাকে প্রবাসীরা

বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মাসের পর মাস প্রস্তুতি, জমিজমা বিক্রি কিংবা ঋণ করে অর্থের জোগান। কিন্তু সব প্রস্তুতি শেষে বিমানবন্দরে গিয়ে আটকে যাচ্ছে অনেকের বিদেশযাত্রা। ভিসার অসংগতি, জাল কাগজপত্র, বিএমইটি ছাড়পত্রে ত্রুটি এবং ইমিগ্রেশন জিজ্ঞাসাবাদে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্যের কারণে প্রতিনিয়ত যাত্রা বাতিল হচ্ছে বাংলাদেশিদের।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশের বিমানবন্দরগুলো থেকে ৮১ হাজার ৫০০ জনের বেশি যাত্রীকে বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া হয়েছে। অথচ একই সময়ে ২ কোটি ৯১ লাখের বেশি মানুষ বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ২৬ লাখ ২২ হাজার ৭১১ জন বাংলাদেশি বিদেশে গেছেন। এ সময়ে ৭ হাজার ৮১৯ জনকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়। ২০২৫ সালে ৫৭ লাখ ৮ হাজার ১৩২ জন বিদেশে গেলেও আটকে দেওয়া হয় ১৫ হাজার ৫১৬ জনকে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে ১৮ হাজার ৯ জন, ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৮৭২ জন, ২০২২ সালে ১৮ হাজার ৭৫৬ জন এবং ২০২১ সালে ১১ হাজার ৫২৮ জনের বিদেশযাত্রা আটকে দেওয়া হয়।
জাল ভিসা ও অনুমোদনপত্রে প্রতারণা
ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিসার অমিল, জাল অনুমোদনপত্র এবং জনশক্তি ছাড়পত্রের অসংগতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বন্ধ বা সীমিত শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য কিছু প্রতারক চক্র ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করছে।
সম্প্রতি ওমানে স্বামীর কাছে যাওয়ার কথা বলে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন তসলিমা বেগম (ছদ্মনাম)। তাঁর কাছে বিএমইটির ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল। তবে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর বক্তব্যে অসংগতি পাওয়া যায়।
পরে তাঁর বিয়ের ছবি পরীক্ষা করে ডিজিটাল কারসাজির প্রমাণ মেলে। আরও তদন্তে জানা যায়, একই স্বামীর নামে একই স্পাউস ভিসার অনুমোদনপত্র ব্যবহার করে পাঁচজন ভিন্ন নারী ওমানে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ফলে তসলিমার যাত্রা বাতিল করা হয়।
ইমিগ্রেশন সূত্র বলছে, সরকারি সিল, স্বাক্ষর ও অনুমোদনপত্র নকল করে প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা জালিয়াতি ও অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে অন্তত ২৩টি দেশের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ।
ইতালির ভিসা নিয়েও অভিনব জালিয়াতি
ভিসা জালিয়াতির নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘পৃষ্ঠা প্রতিস্থাপন’ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে বৈধ ভিসাধারীর পাসপোর্ট থেকে ভিসার পৃষ্ঠা কেটে নিয়ে অন্য ব্যক্তির পাসপোর্টে বসিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি যাত্রীর চেহারার সঙ্গে মূল ভিসাধারীর মিল রাখার চেষ্টা করা হয়, যাতে সহজে প্রতারণা ধরা না পড়ে।
এ ছাড়া জাল সুইস পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশে ফেরার সময় এক বাংলাদেশি নাগরিককে ঢাকার বিমানবন্দরে আটক করা হয়। প্রায় ১০ হাজার ইউরো দিয়ে কেনা ওই পাসপোর্টটি পরীক্ষায় সম্পূর্ণ জাল বলে শনাক্ত হয়।
অন্যদিকে, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার বিপজ্জনক পথের পাশাপাশি ব্রাজিল ও মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টাও বাড়ছে। এ ধরনের যাত্রায় কেউ কেউ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
হয়রানির শিকার বৈধ যাত্রীরাও
তবে বিমানবন্দরে আটকে পড়া প্রত্যেক যাত্রীই যে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত, তা নয়। বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকার পরও অনেক যাত্রী অযৌক্তিক জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তালহা রহমান নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বৈধ কাগজপত্র নিয়ে থাইল্যান্ড যাওয়ার সময় ইমিগ্রেশনে অস্বাভাবিক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন। কেন ভারতে না গিয়ে প্রথমবারেই থাইল্যান্ড যাচ্ছেন, এমন প্রশ্ন করা হয় তাঁকে। একপর্যায়ে তাঁর যাত্রা বাতিলের কথাও জানানো হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় দেওয়ার পর তাঁকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
একইভাবে বৈধ ভিসা ও বিএমইটি ছাড়পত্র থাকার পরও মালয়েশিয়াগামী আশিকুর রহমানকে (ছদ্মনাম) আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর হঠাৎ করেই তাঁকে বিমানে ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়।
এসব ঘটনায় বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যাচাই প্রক্রিয়ায় সমন্বয়ের অভাব
অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির মনে করেন, শুধু দালাল বা প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিএমইটি এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসের শ্রম শাখার কার্যক্রমেও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় তথ্যব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। এতে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই সন্দেহজনক ভিসা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও যাত্রাপথ সম্পর্কে সতর্কতা পাওয়া সম্ভব হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে ইমিগ্রেশন পুলিশকে সক্রিয় রাখা হয়েছে। এ জন্য কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। তবে পুলিশকে ঘুষ দিয়ে পার পাওয়া এবং বৈধ যাত্রীদের অন্যায়ভাবে আটকে দেওয়ার অভিযোগও সত্য বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক একটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভিসা জালিয়াতি প্রতিরোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছে তাঁর মন্ত্রণালয়। তবে অধিকাংশ দেশের ভিসা যাচাই করার সক্ষমতা বিএমইটির নেই বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিএমইটির ভিসা যাচাইয়ের সুযোগ মাত্র চার-পাঁচটি দেশের ক্ষেত্রে রয়েছে। এ সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র। এমনকি বিএমইটির কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জাল কাগজপত্রের ভিত্তিতে ছাড়পত্র দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সার্বিয়ার জাল ভিসায় বিএমইটির ছাড়পত্র দেওয়ার একটি ঘটনা সামনে আসার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সার্বিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও লিবিয়াসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ভিসা কঠোরভাবে যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিদেশযাত্রায় প্রতারণা ঠেকাতে যেমন কঠোর যাচাই প্রয়োজন, তেমনি বৈধ যাত্রীদের হয়রানি বন্ধ করাও জরুরি। কারণ বিমানবন্দর থেকে একজন যাত্রীকে ফিরিয়ে দেওয়া মানে শুধু একটি ফ্লাইট মিস করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের সঞ্চয়, ঋণের বোঝা এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন।



