
ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন গ্রহণের জন্য ইনজেকশনের বিকল্প হিসেবে মুখে খাওয়ার উপযোগী ন্যানোক্যাপসুল তৈরি করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) একদল গবেষক। তাঁদের দাবি, ক্যাপসুলটির মাধ্যমে কম খরচে, ব্যথামুক্তভাবে এবং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে শরীরে ইনসুলিন সরবরাহ করা সম্ভব হবে। গবেষণাটি এখন পর্যন্ত পরীক্ষাগার ও প্রাণীর ওপর প্রয়োগের পর্যায়ে সফল হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি না হলে কিংবা উৎপন্ন ইনসুলিন যথাযথভাবে কাজ না করলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে সেই অবস্থাকে ডায়াবেটিস বলা হয়। এ রোগে শরীরে ইনসুলিনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে অথবা ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
ইনসুলিন মানবদেহের অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে গেলে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়ে। ইনসুলিন রক্তের শর্করাকে শরীরের বিভিন্ন কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। পরে কোষগুলো সেই শর্করা ব্যবহার করে শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপন্ন করে।
গবেষক দলের প্রধান যবিপ্রবির ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. কিশোর মজুমদার বলেন, বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে ৬০ কোটির বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। তাঁর ভাষ্য, যেকোনো ধরনের ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ইনসুলিন অত্যন্ত কার্যকর, ভালো ও নিরাপদ ওষুধ।
তবে ইনজেকশনের মাধ্যমে ইনসুলিন নিতে গিয়ে ব্যথা পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক রোগী তা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেন বলে জানান অধ্যাপক কিশোর মজুমদার। তাঁর মতে, এ কারণে অনেক রোগী ইনসুলিন নিতে চান না। ইনসুলিন ব্যবহারের পর কখনো কখনো রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে গিয়ে গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ অবস্থাকে বলা হয় হাইপোগ্লাইসেমিক শক, যা রোগীর মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এসব সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে রোগীদের জন্য ব্যথামুক্ত বিকল্প তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
অধ্যাপক কিশোর মজুমদার বলেন, তাঁরা যে ক্যাপসুলটি তৈরি করেছেন, সেটিকে ‘কৃত্রিম অগ্ন্যাশয়’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, শরীরে রক্তে শর্করার মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্যাপসুলটি ইনসুলিন নিঃসরণ করবে এবং শর্করা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে। ক্যাপসুল তৈরিতে ব্যবহৃত সব উপাদান বিষমুক্ত ও জৈবভাবে পচনশীল বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ক্যাপসুলটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে।
গবেষক আরও জানান, ক্যাপসুলটি ইঁদুরের ওপর প্রয়োগ করে তাঁরা ইতিবাচক ফল পেয়েছেন। এখন মানুষের ওপর প্রয়োগের জন্য সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া গেলে পরবর্তী পর্যায়ে মানুষের ওপর এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী দুই বছরের মধ্যে ক্যাপসুলটি বাজারে আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন অধ্যাপক কিশোর মজুমদার। তবে মানুষের ওপর পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ধাপ পেরোনোর পরই এর ব্যবহার ও বাজারজাতকরণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।



