
চোখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ব্যথা নেই, লালভাবও নেই। তাই চোখ সুস্থ আছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এমন ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। চোখের কিছু গুরুতর রোগ কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। রোগী যখন দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন বুঝতে পারেন, তত দিনে চোখের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ভারতের গুরুগ্রামের পারাস হেলথের চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের পরামর্শক চিকিৎসক ঋষি ভরদ্বাজ এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। হিন্দুস্তান টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, চোখের কিছু রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তাই শুধু চশমার পাওয়ার পরীক্ষা করানো যথেষ্ট নয়, চোখের সামগ্রিক স্বাস্থ্য যাচাইয়ে নিয়মিত পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা করানোও জরুরি।
গ্লুকোমা: প্রথম দিকে বোঝা কঠিন
গ্লুকোমা এমন একটি রোগ, যাতে চোখের দৃষ্টি-স্নায়ু ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রোগটির প্রাথমিক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক থাকলেও পার্শ্ববর্তী দৃষ্টিশক্তি কমতে শুরু করতে পারে। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি দৈনন্দিন কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে গেলেও দৃষ্টিশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা বুঝতে পারেন না।
এ কারণে রোগটি শনাক্ত হতে দেরি হলে স্থায়ী দৃষ্টিহানির ঝুঁকি বাড়ে। চোখে কোনো সমস্যা অনুভব না করলেও নিয়মিত পরীক্ষা করানো তাই গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি: লক্ষণ ছাড়াই বাড়তে পারে ক্ষতি
ডায়াবেটিসের কারণে চোখের রেটিনায় যে ক্ষতি হয়, তাকে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বলা হয়। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে রেটিনার সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানান চিকিৎসক ঋষি ভরদ্বাজ।
এতে রেটিনায় ফোলাভাব, রক্তনালি থেকে তরল বের হওয়া কিংবা অস্বাভাবিক রক্তনালি তৈরি হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে এসব পরিবর্তন ঘটলেও রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক থাকতে পারে। ফলে সমস্যা গুরুতর হওয়ার আগে অনেকেই তা বুঝতে পারেন না।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত রেটিনা পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। পাশাপাশি রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখলে চোখের ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে সহায়তা পাওয়া যায়। নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করাও সহজ হয়।
পূর্ণাঙ্গ চোখ পরীক্ষায় কী কী দেখা হয়?
চোখের স্বাস্থ্য যাচাইয়ের জন্য শুধু দৃষ্টিশক্তির চার্টে অক্ষর পড়তে পারা যথেষ্ট নয়। চিকিৎসক ঋষি ভরদ্বাজের মতে, রোগীর বয়স, আগের চিকিৎসার ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি বিবেচনা করে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হতে পারে।
এসব পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে চোখের ভেতরের চাপ পরিমাপ, দৃষ্টি-স্নায়ু ও রেটিনা পরীক্ষা এবং পার্শ্ববর্তী দৃষ্টিশক্তি যাচাই। প্রয়োজন অনুযায়ী চোখের মণি প্রসারিত করে চোখের ভেতরের অংশও পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে এমন কিছু পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব, যা সাধারণ দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে।
কারা নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করাবেন?
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত রেটিনা পরীক্ষা করানো উচিত। যাদের পরিবারে গ্লুকোমার ইতিহাস রয়েছে, বয়স বাড়ছে কিংবা চোখের রোগের অন্যান্য ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদেরও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
চোখে কোনো সমস্যা অনুভব না করলেও পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। কারণ, কিছু রোগের ক্ষেত্রে উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার আগেই চোখের ক্ষতি শুরু হতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা গেলে দৃষ্টিশক্তি রক্ষার সম্ভাবনা বাড়ে।
চোখের সুস্থতা তাই শুধু স্পষ্ট দেখার ওপর নির্ভর করে না। নিয়মিত পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা করানোর মাধ্যমে নীরবে বাড়তে থাকা রোগ শনাক্ত করা এবং দৃষ্টিশক্তির স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।



