অন্য খবর

খাবারের পরপরই গ্রিন টি পান করলে শরীরে কী হয়?

গ্রিন টি বা সবুজ চা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ পানীয় হিসেবে পরিচিত। এর বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও রয়েছে। তবে দুপুরের বা রাতের খাবারের সঙ্গে কিংবা খাওয়ার পরপরই গ্রিন টি পান করলে খাবার থেকে শরীরে আয়রন শোষণের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে গ্রিন টি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তবে কখন এটি পান করা হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁদের শরীরে আয়রনের ঘাটতি রয়েছে বা এ ধরনের ঘাটতির ঝুঁকি বেশি, তাঁদের বিষয়টি খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

গ্রিন টিতে থাকা কিছু যৌগ খাবারের আয়রনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শরীরে সেই আয়রন শোষণের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিষয়টি সম্পর্কে জানা থাকলে আয়রন গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেও গ্রিন টি পান করা সম্ভব।

গ্রিন টি কীভাবে আয়রন শোষণে প্রভাব ফেলে?

গ্রিন টিতে ট্যানিনসহ বিভিন্ন ধরনের পলিফেনল থাকে। এসব যৌগ পরিপাকতন্ত্রে আয়রনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ‘নিক্যাল কেস রিপোর্টস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, এ ধরনের মিথস্ক্রিয়ার কারণে খাবার থেকে শরীরের আয়রন শোষণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এর প্রভাব মূলত নন-হিম আয়রনের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। মসুর ডাল, শিম, সবুজ শাকসবজি ও বিভিন্ন ধরনের বীজের মতো উদ্ভিদজাত খাবারে এ ধরনের আয়রন পাওয়া যায়। অন্যদিকে, মাংস ও সামুদ্রিক খাবারে হিম আয়রন থাকে, যা সাধারণত উদ্ভিদজাত খাবারের নন-হিম আয়রনের তুলনায় শরীরে সহজে শোষিত হয়।

খাবারের সঙ্গে বা খাওয়ার ঠিক পরপর গ্রিন টি পান করলে এর পলিফেনল খাবারে থাকা নন-হিম আয়রনের শোষণ কমিয়ে দিতে পারে। তবে এই প্রভাব সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। কতটা চা পান করা হচ্ছে, খাবারে কী কী উপাদান রয়েছে এবং ব্যক্তির শরীরে আয়রনের বর্তমান অবস্থা কেমন, তার ওপর প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করতে পারে।

তবে গ্রিন টি শরীরের সব ধরনের আয়রন শোষণ বন্ধ করে দেয়, বিষয়টি এমন নয়। মূলত এর সঙ্গে গ্রহণ করা খাবারে থাকা নির্দিষ্ট ধরনের আয়রনের শোষণ কমে যেতে পারে।

খাবারের পর গ্রিন টি পানের ক্ষেত্রে কাদের সতর্ক থাকা উচিত?

শরীরে পর্যাপ্ত আয়রন রয়েছে এমন বেশির ভাগ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের পর মাঝেমধ্যে গ্রিন টি পান করলেই আয়রনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম। তবে যাঁদের আগে থেকেই আয়রনের ঘাটতি রয়েছে কিংবা ঘাটতির ঝুঁকি বেশি, তাঁদের জন্য চা পানের সময়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি শ্রেণির মানুষের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

নিরামিষভোজী ব্যক্তি: যাঁরা মূলত উদ্ভিদজাত খাবার থেকে আয়রন গ্রহণ করেন, তাঁদের নন-হিম আয়রন শোষণে প্রভাব ফেলে এমন বিষয়গুলোর দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।

রক্তস্বল্পতা বা কম ফেরিটিনের সমস্যা রয়েছে যাঁদের: রক্তে ফেরিটিনের মাত্রা কম থাকা শরীরে আয়রনের সঞ্চয় কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে আয়রন শোষণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এমন বিষয়গুলো এড়িয়ে চলা সহায়ক হতে পারে।

যেসব নারীর মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হয়: নিয়মিত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই তাঁদের খাবার থেকে পর্যাপ্ত আয়রন গ্রহণ এবং তা শোষণের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

যাঁদের শরীরে আয়রনের চাহিদা বেশি: জীবনের কিছু পর্যায়ে শরীরে আয়রনের প্রয়োজন বেড়ে যায়। যেমন, গর্ভাবস্থায় আয়রনের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এ সময় আয়রন গ্রহণ ও শোষণের বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে।

খাওয়ার কতক্ষণ পর গ্রিন টি পান করবেন?

গ্রিন টি পছন্দ করেন বলে এটি পান করা পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং খাবারের সঙ্গে পান না করে দিনের অন্য সময়ে পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

খাবার খাওয়া এবং গ্রিন টি পানের মধ্যে প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টার ব্যবধান রাখা একটি বাস্তবসম্মত উপায়। এতে খাবার থেকে আয়রন শোষণে চায়ের পলিফেনলের সম্ভাব্য বাধা কমানো যেতে পারে।

শুধু গ্রিন টি নয়, অন্যান্য ধরনের চা ও কফির ক্ষেত্রেও একই বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এসব পানীয়তে থাকা পলিফেনলও নন-হিম আয়রন শোষণে প্রভাব ফেলতে পারে।

যাঁদের আয়রনের ঘাটতি শনাক্ত হয়েছে, তাঁদের খাবারের কাছাকাছি সময়ে চা বা কফি পান করার বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিত। নির্ধারিত আয়রন সম্পূরক গ্রহণের সময়ও এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চা ও কফি থেকে আয়রন শোষণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে সম্পূরক কখন গ্রহণ করতে হবে, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা প্রয়োজন।

খাবার থেকে আয়রন শোষণ বাড়াবেন যেভাবে

গ্রিন টি পানের সময়ের দিকে নজর রাখার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনলেও শরীরে আয়রন শোষণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

১. আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি রাখুন

ভিটামিন সি উদ্ভিদজাত খাবারে থাকা নন-হিম আয়রন শোষণে সাহায্য করে। ‘রিসার্চ জার্নাল অব ফার্মেসি অ্যান্ড টেকনোলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ উপাদান গ্রহণ করলে শরীর উদ্ভিদজাত উৎস থেকে বেশি আয়রন শোষণ করতে পারে।

এ জন্য মসুর ডাল, শিম বা শাকসবজির সঙ্গে টমেটো, আমলকী, পেয়ারা কিংবা লেবুজাতীয় ফল খাওয়া যেতে পারে।

২. খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন

নিয়মিত খাবারের তালিকায় মসুর ডাল, শিম, শাকসবজি ও বিভিন্ন ধরনের বীজ রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাও জরুরি। বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমে শরীরের প্রয়োজনীয় আয়রন পাওয়ার সুযোগ বাড়ে।

৩. আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের পরপরই চা পান এড়িয়ে চলুন

দুপুরের বা রাতের খাবারের সঙ্গে গ্রিন টি পান না করে খাবারের মধ্যবর্তী সময়ে পান করা ভালো। খাবার ও চা পানের মধ্যে ব্যবধান রাখলে চায়ের পলিফেনলের কারণে আয়রন শোষণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পেতে পারে।

সব মিলিয়ে, গ্রিন টি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকলে বা ঘাটতির ঝুঁকি বেশি হলে খাবারের সঙ্গে চা পান না করা, আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি গ্রহণ করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা গুরুত্বপূর্ণ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button